সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি :
আমাদের ওয়েবসাইটে আপনাকে স্বাগতম...

একজন মানুষ কেন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে? অপরাধপ্রবণতার পেছনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ

আফিফা নৌশিন চৌধুরী:-

একজন মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে, নাকি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যক্তিগত মানসিকতার প্রভাবে অপরাধের পথে পা বাড়ায়—এটি সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অপরাধ কখনো ব্যক্তির সচেতন সিদ্ধান্তের ফল, কখনো দীর্ঘদিনের নেতিবাচক পরিবেশ, হতাশা, অপরাধী চক্রের প্রভাব কিংবা নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অপরাধের কারণ যা-ই হোক, অপরাধের দায় এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অপরাধপ্রবণতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ রাজু আহাম্মেদের অভিজ্ঞতা ও অধ্যয়ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওসি মোঃ রাজু আহাম্মেদ জানান, পুলিশের চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তাঁর পেশাগত দায়িত্বের বড় একটি অংশ অপরাধ ও অপরাধীদের নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের ধরন, অপরাধীদের কর্মকাণ্ড এবং অপরাধ সংঘটনের পেছনের বিভিন্ন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তাঁর মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়—একজন মানুষ কেন অপরাধ করেন, কীভাবে একজন মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠেন এবং এর পেছনে কী কী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গভীরভাবে জানার আগ্রহ থেকেই তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় এ বিষয়ে পড়াশোনা ও অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে একটি কোর্সও সম্পন্ন করেন বলে জানান। তাঁর এই আগ্রহ অপরাধকে শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং এর পেছনের কারণ ও প্রভাব বোঝার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে।

অপরাধ দমনের পাশাপাশি অপরাধের কারণ চিহ্নিত করা, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ ধরনের অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রধান কিছু কারণ

১. দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকট

অর্থনৈতিক সংকট অপরাধপ্রবণতার অন্যতম আলোচিত সামাজিক কারণ। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ঋণের বোঝা, পারিবারিক অভাব এবং মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা কিছু মানুষকে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা মাদক ব্যবসার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

তবে দরিদ্র হওয়া মানেই অপরাধী হওয়া নয়। অসংখ্য মানুষ কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করেন। তাই দারিদ্র্যকে অপরাধের একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য, সুযোগের অভাব এবং অন্যান্য পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

২. পারিবারিক অশান্তি ও শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা

একটি শিশুর নৈতিকতা, আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। কিন্তু পরিবারে নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদ, নির্যাতন, অবহেলা, মাদকাসক্তি কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপস্থিতি শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যে শিশু ছোটবেলা থেকে সহিংসতা দেখে বড় হয়, সে কখনো কখনো সহিংস আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে শেখে। আবার পারিবারিক স্নেহ, তত্ত্বাবধান ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব তাকে ভুল সঙ্গ কিংবা অপরাধী চক্রের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে।

তবে শৈশবে প্রতিকূল অভিজ্ঞতা থাকা মানেই ভবিষ্যতে অপরাধী হয়ে ওঠা নয়। ভালোবাসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং ইতিবাচক সামাজিক সহযোগিতা একজন মানুষকে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।

৩. খারাপ সঙ্গ ও অপরাধী চক্রের প্রভাব

মানুষ সামাজিক জীব। তার চিন্তাভাবনা, আচরণ ও সিদ্ধান্তের ওপর বন্ধু, পরিচিতজন এবং আশপাশের মানুষের প্রভাব থাকে। কোনো ব্যক্তি যখন নিয়মিত অপরাধপ্রবণ মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করেন, তখন ধীরে ধীরে অপরাধকে স্বাভাবিক বা লাভজনক হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারেন।

প্রথমে ছোটখাটো অনিয়ম, পরে মাদক গ্রহণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বন্ধুদের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অপরাধী চক্র অনেক সময় অর্থ, ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা নিরাপত্তার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে। একপর্যায়ে তারা অপরাধের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে পড়তে পারে যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে ওঠে।

৪. মাদকাসক্তি ও অপরাধের সম্পর্ক

মাদকাসক্তি কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মাদক সংগ্রহের জন্য অর্থের প্রয়োজন, বিচারবুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত কিংবা মাদককে কেন্দ্র করে সংঘটিত অবৈধ লেনদেন একজন মানুষকে অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রও তরুণদের অপরাধে যুক্ত করার একটি মাধ্যম হতে পারে। তবে মাদক গ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধী নন। মাদকনির্ভরতা একটি জটিল স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা, যার সমাধানে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।

৫. নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও লোভ

অপরাধের পেছনে সব সময় অভাব কাজ করে না। অনেক সময় অতিরিক্ত অর্থ, ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

যখন কোনো ব্যক্তি নিজের স্বার্থকে অন্যের অধিকার ও সামাজিক দায়িত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন তিনি ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন যে অর্থ ও ক্ষমতার জোরে আইন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, তাহলে তাঁর মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা বাড়তে পারে। অপরাধ করে বারবার পার পেয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁকে আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে।

৬. বিচারহীনতা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ

সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অপরাধের শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো ব্যক্তি যদি দেখেন যে অপরাধ করেও প্রভাব, অর্থ কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পার পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতি কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

আইনের কার্যকর প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। তবে অপরাধ কমানোর দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৭. মানসিক চাপ, হতাশা ও প্রতিশোধপরায়ণতা

ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অপমান, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কিংবা প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা কখনো কখনো মানুষকে সহিংস বা অপরাধমূলক আচরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

কেউ কেউ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মারামারি, হামলা কিংবা অন্যের ক্ষতি করার মতো কাজ করেন। আবার কোনো ব্যক্তি অপমানের প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পিত অপরাধেও জড়িয়ে পড়তে পারেন।

তবে মানসিক চাপ বা মানসিক অসুস্থতা থাকলেই কেউ অপরাধী হয়ে ওঠেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধের পেছনে একাধিক ব্যক্তিগত ও সামাজিক উপাদান কাজ করতে পারে। তাই অপরাধের কারণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিস্থিতি, আচরণ, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি।

অপরাধ প্রতিরোধে করণীয়

অপরাধ প্রতিরোধে শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; অপরাধের পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারে শিশুদের প্রতি যত্ন, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে

একজন মানুষ কেন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন—এর উত্তর কোনো একটি কারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি, খারাপ সঙ্গ, মাদক, লোভ, প্রতিশোধপরায়ণতা, সামাজিক বৈষম্য এবং বিচারহীনতার মতো বিভিন্ন বিষয় একজন ব্যক্তির অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া প্রত্যেক মানুষ অপরাধ করেন না। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক সহায়তা, মূল্যবোধ এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

যাত্রাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ রাজু আহাম্মেদের অপরাধপ্রবণতা নিয়ে পড়াশোনা ও কোর্স করার অভিজ্ঞতা এ বিষয়টি বোঝার গুরুত্ব তুলে ধরে। অপরাধের ধরন ও অপরাধীদের আচরণ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে অপরাধের কারণ চিহ্নিত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সুতরাং, অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্য একদিকে যেমন অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে তেমনি অপরাধপ্রবণতার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকর পথ হলো অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি অপরাধের পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

© All rights reserved © 2026 দৈনিক নতুন সকাল
Design & Developed BY https://starwebhostit.com/