সোমবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং, ৭ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, রাত ১১:২৮
শিরোনাম
Thursday, January 14, 2016 2:05 am | আপডেটঃ January 14, 2016 7:51 AM
A- A A+ Print

সাজেক ভ্যালি : ঘুরে এলাম মেঘের দেশে

সাইফুল আহমেদ : ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি পাহাড় ও নদীর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে আমি পাহাড়কেই বেছে নেব।’

প্রকৃতির যে কোনো অনুষঙ্গের মধ্যে আমাকেও যদি কেউ বেছে নিতে বলেন, আমি পাহাড়ের কথাই বলবো। সুউচ্চ পাহাড়ের নিঃস্তব্ধতা, একাকিত্ব আমাকে টানে। নয়নাভিরাম সবুজের মাঝে যুগ যুগ ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। পাহাড়ি জ্যোৎস্নায় স্নান করার ইচ্ছাও ছোটবেলা থেকেই। এলোমেলো পাহাড়ি পথে হাঁটতে কষ্ট হয়, তবে সে কষ্টের মধ্যে আনন্দও আছে। আর যদি ক্ষণজন্মা ইংরেজ কবি জন কিটসের ‘ওড টু মেলানকোলি’ কবিতার মতো বলি, তাহলে বলতে হয়, আসল আনন্দতো বেদনার পাশাপাশিই অবস্থান করে। আর এসবের সঙ্গে যদি যোগ হয় উড়ন্ত সফেদ মেঘের হাতছানি তাহলে তো কথাই নেই।

সাংবাদিক হওয়ায় ছুটিছাটা খুব কমই পাই। অনেক সময় ঈদেও অফিস করতে হয়। এই যেমন গত রোজার ঈদও পরিবার-পরিজন ছেড়ে অফিসে কাটিয়েছি। হাজার হোক, কর্মই তো ধর্ম! অনেক সময় ‘অর্জিত ছুটি’ পাই। তবে তখন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে যে কোথাও থেকে ঘুরে আসব, সে সুযোগ নেই। কারণ অফিসের ‘পিক সিজন’ হওয়ায় সে সময় বন্ধুরা ছুটি নিতে পারে না।

index
এবার কোরবানির ঈদে ছুটি পাব, এটি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল। তাই রোজার ঈদের পরই কয়েকজন বন্ধুকে ‘নক’ করলাম। সাংবাদিক বন্ধু সাইফ খন্দকার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বন্ধু হাসান মাহমুদ ও তার সহকর্মী দেবাশিষ বিশ্বাস স্যার রাজি হয়ে গেলেন।

সিদ্ধান্ত হলো কোরবানি ঈদের পরদিন যাব। ঈদের চার দিন আগে টিকিট কাটতে গেলাম। তবে ঈদের পরের দিনের টিকিট পাওয়া না যাওয়ায় অগত্যা ঈদের দিন রাতের টিকিট কাটতে হলো। ভাড়া জনপ্রতি ৫৮০ টাকা।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, বৃহস্পতিবার রাত ১০ টায় সাজেকের উদ্দেশে ঈগল পরিবহণের বাসে উঠে পড়লাম। মেঘের দেশে যাত্রা হলো শুরু। ভেবেছিলাম সকালে গিয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছাব। তবে ভাবনার চেয়ে আগেই গিয়ে পৌঁছলাম ভোর ৪টা। পড়লাম বিপদে।

সাজেক ভ্যালি রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায়। তবে সড়কপথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে যেতে হয় চাঁদের গাড়ি কিংবা সিএনজিতে। লোক কম হলে মোটরসাইকেল রিজার্ভ করেও যাওয়া যায়। তবে আকাবাঁকা, উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ হওয়ায় দিনের আলো ছাড়া সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া যায় না। তাই আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। সিন্ধান্ত নিলাম, এই দুই/তিন ঘণ্টা রাস্তায় না থেকে কোনো হোটেলে উঠে কিছুটা ভ্রমণক্লান্তি দূর করে নিই। নিকটস্থ মানসম্মত হোটেল গাইরিংয়ে উঠলাম আমরা চারজন। সেখানে খানিকটা বিশ্রাম ও সকালের নাস্তা সম্পন্ন করতে করতে ১০টা বেজে গেল।
নাস্তা শেষ। এবার সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পালা। গেলাম চাঁদের গাড়ি ঠিক করতে। শুনলাম রিজার্ভ যেতে হবে, ভাড়া ৮-১০ হাজার টাকা। চারজনের জন্য এই টাকা খরচ করে একটি গাড়ি রিজার্ভ নেওয়াটা একটু ‘অপচয়ই’ মনে হলো। খোঁজ করতে লাগলাম, কারো সঙ্গে দল বেঁধে যাওয়া যায় কি না। পেয়েও গেলাম। চট্টগ্রাম থেকে ১১ জনের একটি দল এসেছিল সাজেকে যাবে বলে। তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম আমরা চারজন ও তিনজনের আরেকটি দল।

index-2

সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো। দুপুর ১২টার দিকে রিজার্ভ চাঁদের গাড়ি সাজেকের উদ্দেশে রওনা শুরু করলো। আমরা ১২ জন গাড়ির ভেতরে বসলাম, দুজন ড্রাইভারের পাশের সিটে ও বাকি চারজন গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে।

কিছু ক্ষণ পথ চলার পরই বুঝতে পারলাম, সাজেকের পথে ভ্রমণের আসল মজা গাড়ির ভেতরে বসে নয়। গাড়ির ভেতর থেকে মনে হচ্ছিল, কারাগারের ভেতর আছি। রাস্তার দুজনের পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, তবে গাড়ির গ্রিলগুলো সেই অপার সৌন্দর্য অবলোকনে যেন বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তাই যাত্রা শুরুর আধা ঘণ্টা পরই আমরা ড্রাইভারের পেছনের ১৬ জনের ১২ জনই গাড়ির ছাদে উঠে বসলাম।
সাজেকে যাওয়ার পথে দীঘিনালা উপজেলার ১০ মাইল ঝরণায় থামলাম। তখন বাজে দুপুর ২টার মতো। ১০ মাইল ঝরণাও চমৎকার প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত জায়গা। মূল সড়ক থেকে আধা কিলোমিটার ভেতরে এর অবস্থান। যেতে হয় চার/পাঁচটা ছোট ঝির পাড়ি দিয়ে। ঝরণাটা মোটামুটি বড় এবং পানির স্রোতও প্রবল। সেখানে দুপুরের স্নান সেরে নিলাম। ফ্রেশ হয়ে আমার আবার যখন সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম ততক্ষণে বিকেল সাড়ে ৩টা বেজে গেছে।

আমরা কয়েকজন আবার গাড়ির ছাদে উঠে বসলাম। আসলে, সাজেক ভ্যালি যাওয়ার পথে আসল মজাটাই পাওয়া যায় গাড়ির ছাদে। এখান থেকে পাহাড় যেমন দুচোখ জুড়িয়ে দেখা যায়, তেমনি আকাবাঁকা উঁচুনিচু সুদীর্ঘ পথের সৌন্দর্যও তৃপ্তি সহকারে অবলোকন করা যায়। বিকেল হওয়ায় সূর্যের উত্তাপ আমাদের তেমন ক্লান্ত করতে পারেনি। মেঘমিশ্রিত হিমেল বাতাস আর ধীরে ধীরে দিগন্তের কোলে ঢলে পড়া সূর্যের মিষ্টি রোদ্দুর আমাদের সফরকে আরো উপভোগ্য করে তুললো।
সাজেক ভ্যালি দীঘিনালার ১০ মাইল ঝরণা থেকেও প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর এই ৭০ কিলোমিটার পথের পুরোটাই দৃষ্টিনন্দন, প্রাকৃতিক শোভায় সজ্জিত। শহরে জীবনের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এই সবুজ পাহাড়ের মাঝে জীবনের যান্ত্রিকতা এক নিমিষেই হারিয়ে যায়, এমনই এক জাদুকরি শক্তি আছে এখান প্রকৃতির মাঝে। সাজেকে যাওয়ার পথে চাঁদের গাড়ির ছাদে বসে আমার কেবল একটি কথাই বারবার মনে হয়েছে, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো...’।

অবশেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমরা বাংলাদেশের দার্জেলিং, মেঘের দেশ, পাহাড়ারণ্যের ভূমি, দেশের সর্বোচ্চ সড়ক সাজেক ভ্যালিতে পৌঁছলাম। ততক্ষণে সূর্য বাড়ি ফিরে গেছে, পাখিরা নীড়ে ফিরছে, অন্ধকার গুটি গুটি পায়ে এসে তার কালো চাদর দিয়ে প্রকৃতিকে গুণ্ঠিত করছে।

সাজেক ভ্যালিতে তো পৌঁছানো গেল, কিন্তু থাকব কোথায়? থাকার জন্য রয়েছে রূনময় রির্সোট (বিজিবি পরিচালিত), সাজেক রির্সোট (সেনাবাহিনী পরিচালিত), আলোর রির্সোট এবং ক্লাব হাউস। সাজেক রিসোর্টে চারটি রুম আছে। চারটির ভাড়া যথাক্রমে ১০ হাজার, ৯ হাজার, ৮ হাজার ও ৭ হাজার টাকা। তবে পিক সিজন হওয়ায় কোনো রিসোর্টেই রুম খালি পেলাম না। অগত্যা স্থানীয়দের বাসায় ভাড়া থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তবে সমস্যা সেখানেও।

index-3
আমাদের দেশে বড় ছুটি বলতে দুই ঈদেই পাওয়া যায়। তাই ঈদের পর পরই পর্যটনস্পটগুলোতে পর্যটকদের ঢল নামে। এবার সাজেক ভ্যালিতেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো। তাই রিসোর্টে রুম না পেয়ে স্থানীয়দের বাসায় রুম ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করলাম। তবে সেখানেও সহসাই কোনো রুম ফাঁকা পাওয়া গেল না। বহু কষ্টে স্থানীয় প্রশাসক সিয়াতা লুসাইয়ের বাসায় রাত্রিযাপনের সুযোগ পেলাম। রুম ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা। আমরা চারজন এক রুমে উঠলাম।

রুমে উঠে ফ্রেশ হতে হতে রাত সাড়ে ৭টার মতো বেজে গেছে। ভাবলাম, কোথায় এলাম, জায়গাটা একটু ঘুরে দেখা দরকার। যেই ভাবা, সেই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম আমরা চারজন।

পূর্ণিমা রাত। ঘোমটাখসা চাঁদ। সন্ধ্যায় আঁধার যেভাবে ঘিরে ধরেছিল, সেই শৃঙ্খল থেকে পাহাড় ও সাজেক ভ্যালিকে মুক্তি দিয়েছে চাঁদ। সাজেকে বিদ্যুৎ আছে। তবে তা ব্যাটারিসৃষ্ট। সেই বিদ্যুৎ অবশ্য সাজেক রিসোর্ট থেকে ভ্যালির চার্চ পর্যন্ত লোকালয়ে সীমাবদ্ধ। এরপর সাজেক ভ্যালিতে বাসাবাড়িও খুব একটা নেই, তাই বিদ্যুৎও নেই; আছে শুধু অন্ধকার। অন্ধকার জায়গাটুকুতে জ্যোৎস্নায় সাজেকের সড়ক রূপালি ইলিশের মতো চকচক করছে। সেই সড়ক ধরেই চন্দ্রালোকিত রাতে আমরা হাঁটতে হাঁটতে হেলিকপ্টার প্যাড পর্যন্ত গেলাম।

হেলিকপ্টার প্যাডের আশপাশে অনেক খানি জায়গা জুড়ে সবুজ ঘাস। হেলিপ্যাডের পাশেই রয়েছে সূর্যঘড়ির স্থান। সেখানে তিনটি বেঞ্চ রয়েছে দর্শনার্থীদের বসার জন্য। চাঁদের আলোয় রূপালি স্নান সেরে নিতে আমরা সেই বেঞ্চগুলোতে বসলাম। নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে গান বেজে উঠলো, ‘এই মন জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি।। দেখ ওই ঝিলিমিলি চাঁদ সারারাত আকাশে শলমা জরি…।’

সাজেক ভ্যালির এখান থেকেই মেঘ সবচেয়ে ভাল দেখা যায়। আমরাও দেখলাম এক ঝাঁক উড়ন্ত মেঘপাখি। চাঁদের আলোয় অক্লান্ত সফেদ মেঘেরা অদৃশ্য ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এগিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে দৃষ্টির সীমানা পাড়ি দিয়ে অজানার উদ্দেশে।

হঠাৎ অনুভব করলাম, কেমন যেন শীত শীত লাগছে। দিনে আমরা যখন খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রা শুরু করি, তখন সূর্যের তেজে চোখ মেলা যাচ্ছিল না, প্রচণ্ড গরম ছিল। ভাদ্রের শেষে আশ্বিন মাস সবে শুরু। গরম থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক। রাতে একটু গরম কম থাকে, সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এ তো কাপুনি ধরিয়ে দেওয়ার মতো শীত।
পরে বুঝলাম, ঘটনাটা কী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে হওয়ায় সাজেক ভ্যালিতে আমরা মূলত মেঘের মাঝেই ছিলাম। তবে দূরের মেঘ চোখে পড়লেও কাছের মেঘ দেখা যায় না। তা ছাড়া, অনেক উঁচুতে হওয়ায় এখানে বাতাসও উন্মুক্ত ছিল। আর পাহাড়ি অঞ্চলেরও ধর্মই হলো দিনের বেলা গরম ও রাতের বেলা ঠান্ডা।

সূর্যঘড়ির স্থানটিতে ঘণ্টা খানেক সময় কাটিয়ে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম রাতের খাবারের জন্য। রিসোর্টে উঠতে না পারলে সাজেক ভ্যালিতে আপনাকে খাবারের জন্য স্থানীয় সস্তা হোটেলগুলোর মুখাপেক্ষী হতে হবে। সেক্ষেত্রে খাবারের অর্ডার দিতে হবে আগেই। আমাদেরও তা-ই হতো হয়েছিল। রাতে হাঁটতে বের হওয়ার আগে খাবারের অর্ডার দিয়ে বের হয়েছিলাম। আমরা সিয়াতা লুসাই দাকে বলে স্থানীয় একটি হোটেলে খাবারের অর্ডার কাটিয়েছিলাম। খাবারে দুই ধরনের আইটেম ছিল। মুরগি-ভাত ১৫০ টাকা। ডিম-ভাত ১০০ টাকা। আমরা যে যার পছন্দমতো অর্ডার দিয়েছিলাম।

খেতে গিয়ে নতুন দুটি জিনিসের স্বাদ পেলাম। এক, জুম চালের ভাত ও দুই বাঁশকড়ল। আমাদের খাবার পরিবেশন করল দুটি স্থানীয় উপজাতি মেয়ে- একটি ছো্ট্ট মেয়ে ও তার ভাবি। হোটেলটা তাদের পরিবারই চালায়। কী অমায়িক তাদের ব্যবহার! আমাদের সঙ্গে খাবার খেতে বসেছিল আরো ১৫/১৬ জন ছেলে। তারাও ঘুরতে এসেছে। এতগুলো মানুষকে একত্রে খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং সুশৃঙ্খলাভাবে খাবার পরিবেশন শেষ করলো। হিন্দি প্রবাদে বলে, ‘মেহমান ভগবান কি সমান হোতি হ্যায়’ অর্থাৎ ‘মেহমান হলো ভগবানের সমান’। তাদের খাতিরের কমতি রাখতে নেই। ওই মেয়ে দুটি বোধ হয়ে সেই মানসিকতা লালন করে।

খাবার শেষে আবার কিছুক্ষণ হেঁটে এস ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১১টা বেজে গেল। সূর্যোদয় দেখতে হলো ভোর সাড়ে ৪টায় উঠতে হবে। তাই একটু আগেভাগেই ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে লেপ ছাড়া ঘুমাতে পারলাম না!
পরদিন ভোরেই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সাজেক ভ্যালির সড়কে হাঁটতে লাগলাম। সূর্য উঠার আগেই আমরা উঠে পড়লাম। উদ্দেশ্য হ্যালিপ্যাড যাওয়া। সেখান থেকে সূর্যোদয়টা সব থেকে ভাল দেখা যায়। সাজেকের পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথটি খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মনে হয়, এখানেই ঘুমিয়ে থাকি। আমেরিকান লেখক ওয়াশিংটন আরভিংয়ের রূপকথার নায়ক রিপ ভ্যান উইনকেলের মতো। কেউ আমাকে না ডাকুক কয়েকটা বছর। একদিন না হয় জেগে দেখব, সময় বয়ে গেছে অনেকটা দূর। হয়তো রিপের মতো আমি বুড়িয়ে যাব। তবুও শহরের যান্ত্রিকতা, যন্ত্রণা আর কুৎসিত মানুষগুলোর ষড়যন্ত্রমূলক আচরণতো অন্তত পক্ষে সহ্য করতে হবে না!

হ্যালিপ্যাড যাওয়ার পথে বেশ উঁচু উঁচু কয়েকটা গাছ দেখলাম। এগুলো বৈলাম। দেশের সবচেয়ে দীর্ঘকায় গাছ। লম্বায় এরা সর্বোচ্চ ২৪০ ফুট পর্যন্ত হয়। সাজেকে রাতে দেখেছিলাম রূপালি আলোর ঝলকানি। উন্মুক্ত আকাশের বুকে অসংখ্য তারা আর পূর্ণিমার চাঁদের অপূর্ব আলোকসজ্জা। দিনে সূযের সোনালি আলোর অপেক্ষায় হা্ঁটতে লাগলাম। তবে ভোরে যতটুকু আলো ফুটেছে, তাতেই আবিষ্কার করলাম আরেক সাজেক ভ্যালি। সবুজ ও পাহাড়ের প্রাচুর্যে ঘেরা সাজেক ভ্যালি।

সাজেকে ঢেউ খেলানো অসংখ্য উঁচু-নিচু পাহাড়। যেগুলো সবুজ বনানীতে ঘেরা। চোখ জুড়ানো নিসর্গ। এটাকে মেঘপুরীর উপত্যকাও বলা যেতে পারে। পাহাড়ের প্রশস্ত বুক, আদিবাসীদের ঘর-বসতি ও নির্জন প্রকৃতির সঙ্গে দারুণ এক সখ্য আছে ভাসমান মেঘপুঞ্জের। পাহাড়ের বুক চিরে আপন মনে বয়ে চলেছে কাচালং ও মাচালং নামে ছোট দুটি নদী। নদী দুটির রূপ যেন সত্যিই পাহাড়ি কন্যার। দুটি নদীর বুকে প্রায় সব সময় ভাসতে দেখা যায় বাঁশের চালি, যা সবার দৃষ্টি কাড়ে। চালিতে বাঁধা বাঁশ সরাসরি চলে যায় কাপ্তাই লেক হয়ে কর্ণফুলি পেপার মিলে। আর পাহাড়ি পথ বেয়ে চলা রাস্তার দুধারে গড়ে উঠেছে স্থানীয় উপজাতীয়দের গ্রাম। সেসব গ্রামের জনমানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনধারা ঘিরে মুহূর্তেই আপ্লুত হয়ে ওঠে আগন্তুক পথচারীর আবেগ।

আসলে সাজেক ভ্যালির প্রকৃতি ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতে বসে রঙের মেলা। সাজেকের আবহাওয়া ও সৌন্দর্য, রাতের আকাশে চন্দ্র-তারা ও দিনের আলোয় লাল সূর্য মিলেমিশে একাকার। এ দৃশ্য নিমিষেই সবার মনকে উদাস করে তোলে।

সূর্য ওঠার আগেই আমরা হেলিপ্যাডে গিয়ে পৌঁছলাম। আমাদের আগেই আরো অনেক লোক এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে সূর্যোদয় দেখার জন্য। আমাদের পরও আরো অনেক লোক এলো। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত সূর্যোদয়ের দেখা মিলল। দূরে সাজেকের চেয়েও উঁচু আরেকটি পাহাড়ের পেছন থেকে ধীরে ধীরে সূর্য আবির্ভূত হলো। সূর্যটা যেন ওই পাহাড়ের গুহায় সারা রাত লুকিয়ে ছিল। দিনের আলো ফুটতেই গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। মনে হলো, কোনো মহারাজ তার সিংহাসনে আসীন হলেন, আর আমরা সবাই তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। সাজেকে প্রথমবারের মতো আমরা দিনের আলোতে আমরা মেঘের চঞ্চল উড়াউড়ি দেখলাম।

পূর্ণিমা কিংবা সূর্যোদয় যখনই বলেন না কেন, প্রাকৃতিক শোভায় অনন্য সাজেক ভ্যালি। ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক কথায় যাকে বলে অনির্বচনীয়।

index-4

হ্যালিপ্যাডটা রুইলুই পাড়ার কাছাকাছিই অবস্থিত। রুইলুই পাড়াই সাজেক উপত্যকার মূল কেন্দ্র। এখানে লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। পাড়ার সবগুলো বাড়ির রং লাল–সবুজ। রুইলুই পাড়ার নিচ থেকে প্রধান উপত্যকার অংশ শুরু। দীর্ঘ পথ শেষ করে বহুদূরে দাঁড়িয়ে আছে মিজোরামের প্রাচীন সুউচ্চ পাহাড়ের শ্রেণি। রুইলুই পাড়া থেকে ২০ মিনিটের হাঁটা পথ কংলাক পাড়া। পাংখোয়াদের বসবাস এখানে। সব মিলিয়ে ১৫ পরিবারের বসবাস হবে। বিশাল পাথরখণ্ডের পাদদেশেই কংলাক পাড়ার অবস্থান। কংলাকের পাথরচূড়ায় দাঁড়িয়ে পুরো সাজেক উপত্যকা চমৎকারভাবে এক নজরে দেখা যায়। রুই রুই পাড়ার পাদদেশে দারুণ এক সংযোজন অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইল। হ্যালিপ্যাড থেকে সূর্যোদয় দেখার পর আমরা গেলাম অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইলে। সেখানেও রোমাঞ্চকর মুহূর্ত কাটালাম।

অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইল থেকে ফিরে আমরা গেলাম সাজেক ভ্যালিতে প্রবেশের গেটসংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন মন্দিরের পাশের একটি জায়গায়। সেখানে গিয়ে চোখে যা দেখলাম, অবিশ্বাস্য। আমরা ভেবেছিলাম, সাজেক ভ্যালির হ্যালিপ্যাড থেকে মেঘ সব চেয়ে ভাল দেখা যায়। তবে এখানে এসে আমাদের সেই ভুল ভেঙ্গে গেল। যা দেখলাম তাতে মনে হলো সাজেক ভ্যালি যে উদ্দেশ্যে আসা, পাহাড়ের ওপর সেই মেঘ দেখার তেষ্টা এবার পরিতৃপ্ত হলো। অনেকটা ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো আমার গেয়ে উঠতে ইচ্ছে হলো- ‘All at once I saw a crowd/A host of white clouds,/Above the valley, over the hills/Fluttering and dancing in the breeze..।’

সেখান থেকে ফিরে সকাল নাস্তা সেরে নিলাম সেই একই হোটেলে। এবারও ওই উপজাতিদের আতিথেয়তায় বিমুগ্ধ হলাম।

এবার যাওয়ার পালা। আমরা যে চাঁদের গাড়িটি রিসার্ভ নিয়ে এসেছিলাম সেটিতেই ফিরে যাব। ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বেলা ১১টার দিকে বের হলাম। আমরা যে ১৮ জন এসেছিলাম তাদের মধ্যে তিনজন সঙ্গী পেছনে পড়ে গিয়েছিল। তাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম ওই হোটেলটির সামনে। মনে হলো, একটা জিনিস ভুলে গেছি। এই পাহাড়ের মাঝে যারা আমাদের দুবেলা অন্নের ব্যবস্থা করলো তাদের ধন্যবাদটা তো অন্তত দেওয়া উচিত। গাড়ি থেকে নেমে হোটেলে গিয়ে ওই দুই উপজাতি কন্যার খোঁজ করলাম। ছোট্ট মেয়েটিকে পেলাম। তার ভাবিকে পেলাম না। নাম জেনে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। ইতিমধ্যে পেছনে পড়া তিনটি ছেলেও চলে এসেছে। গাড়ি ছেড়ে দিল। একদিনের ভ্রমণ শেষে আবার যাত্রা শুরু হলো প্রকৃতি ছেড়ে যান্ত্রিকতা পথে, প্রথমে খাগড়াছড়ি, তারপর ঢাকার উদ্দেশ্যে।

ঢাকায় আসার পর বন্ধু সাইফ খন্দকার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ছোট্ট মেয়েটির নাম কিরে?’ আমি বললাম, ‘মোয়ানি। অর্থ সান্ত্বনা। প্রকৃতির ছোঁয়ায় বেড়ে ওঠা মোয়ানির বড় অভাব আছে রে এই কংক্রিটের ঢাকা শহরে!

Comments

Comments!

 Natunsokal.com

সাজেক ভ্যালি : ঘুরে এলাম মেঘের দেশে

Thursday, January 14, 2016 2:05 am | আপডেটঃ January 14, 2016 7:51 AM

সাইফুল আহমেদ : ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি পাহাড় ও নদীর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে আমি পাহাড়কেই বেছে নেব।’

প্রকৃতির যে কোনো অনুষঙ্গের মধ্যে আমাকেও যদি কেউ বেছে নিতে বলেন, আমি পাহাড়ের কথাই বলবো। সুউচ্চ পাহাড়ের নিঃস্তব্ধতা, একাকিত্ব আমাকে টানে। নয়নাভিরাম সবুজের মাঝে যুগ যুগ ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। পাহাড়ি জ্যোৎস্নায় স্নান করার ইচ্ছাও ছোটবেলা থেকেই। এলোমেলো পাহাড়ি পথে হাঁটতে কষ্ট হয়, তবে সে কষ্টের মধ্যে আনন্দও আছে। আর যদি ক্ষণজন্মা ইংরেজ কবি জন কিটসের ‘ওড টু মেলানকোলি’ কবিতার মতো বলি, তাহলে বলতে হয়, আসল আনন্দতো বেদনার পাশাপাশিই অবস্থান করে। আর এসবের সঙ্গে যদি যোগ হয় উড়ন্ত সফেদ মেঘের হাতছানি তাহলে তো কথাই নেই।

সাংবাদিক হওয়ায় ছুটিছাটা খুব কমই পাই। অনেক সময় ঈদেও অফিস করতে হয়। এই যেমন গত রোজার ঈদও পরিবার-পরিজন ছেড়ে অফিসে কাটিয়েছি। হাজার হোক, কর্মই তো ধর্ম! অনেক সময় ‘অর্জিত ছুটি’ পাই। তবে তখন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে যে কোথাও থেকে ঘুরে আসব, সে সুযোগ নেই। কারণ অফিসের ‘পিক সিজন’ হওয়ায় সে সময় বন্ধুরা ছুটি নিতে পারে না।

index
এবার কোরবানির ঈদে ছুটি পাব, এটি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল। তাই রোজার ঈদের পরই কয়েকজন বন্ধুকে ‘নক’ করলাম। সাংবাদিক বন্ধু সাইফ খন্দকার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বন্ধু হাসান মাহমুদ ও তার সহকর্মী দেবাশিষ বিশ্বাস স্যার রাজি হয়ে গেলেন।

সিদ্ধান্ত হলো কোরবানি ঈদের পরদিন যাব। ঈদের চার দিন আগে টিকিট কাটতে গেলাম। তবে ঈদের পরের দিনের টিকিট পাওয়া না যাওয়ায় অগত্যা ঈদের দিন রাতের টিকিট কাটতে হলো। ভাড়া জনপ্রতি ৫৮০ টাকা।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, বৃহস্পতিবার রাত ১০ টায় সাজেকের উদ্দেশে ঈগল পরিবহণের বাসে উঠে পড়লাম। মেঘের দেশে যাত্রা হলো শুরু। ভেবেছিলাম সকালে গিয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছাব। তবে ভাবনার চেয়ে আগেই গিয়ে পৌঁছলাম ভোর ৪টা। পড়লাম বিপদে।

সাজেক ভ্যালি রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায়। তবে সড়কপথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে যেতে হয় চাঁদের গাড়ি কিংবা সিএনজিতে। লোক কম হলে মোটরসাইকেল রিজার্ভ করেও যাওয়া যায়। তবে আকাবাঁকা, উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ হওয়ায় দিনের আলো ছাড়া সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া যায় না। তাই আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। সিন্ধান্ত নিলাম, এই দুই/তিন ঘণ্টা রাস্তায় না থেকে কোনো হোটেলে উঠে কিছুটা ভ্রমণক্লান্তি দূর করে নিই। নিকটস্থ মানসম্মত হোটেল গাইরিংয়ে উঠলাম আমরা চারজন। সেখানে খানিকটা বিশ্রাম ও সকালের নাস্তা সম্পন্ন করতে করতে ১০টা বেজে গেল।
নাস্তা শেষ। এবার সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পালা। গেলাম চাঁদের গাড়ি ঠিক করতে। শুনলাম রিজার্ভ যেতে হবে, ভাড়া ৮-১০ হাজার টাকা। চারজনের জন্য এই টাকা খরচ করে একটি গাড়ি রিজার্ভ নেওয়াটা একটু ‘অপচয়ই’ মনে হলো। খোঁজ করতে লাগলাম, কারো সঙ্গে দল বেঁধে যাওয়া যায় কি না। পেয়েও গেলাম। চট্টগ্রাম থেকে ১১ জনের একটি দল এসেছিল সাজেকে যাবে বলে। তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম আমরা চারজন ও তিনজনের আরেকটি দল।

index-2

সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো। দুপুর ১২টার দিকে রিজার্ভ চাঁদের গাড়ি সাজেকের উদ্দেশে রওনা শুরু করলো। আমরা ১২ জন গাড়ির ভেতরে বসলাম, দুজন ড্রাইভারের পাশের সিটে ও বাকি চারজন গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে।

কিছু ক্ষণ পথ চলার পরই বুঝতে পারলাম, সাজেকের পথে ভ্রমণের আসল মজা গাড়ির ভেতরে বসে নয়। গাড়ির ভেতর থেকে মনে হচ্ছিল, কারাগারের ভেতর আছি। রাস্তার দুজনের পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, তবে গাড়ির গ্রিলগুলো সেই অপার সৌন্দর্য অবলোকনে যেন বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তাই যাত্রা শুরুর আধা ঘণ্টা পরই আমরা ড্রাইভারের পেছনের ১৬ জনের ১২ জনই গাড়ির ছাদে উঠে বসলাম।
সাজেকে যাওয়ার পথে দীঘিনালা উপজেলার ১০ মাইল ঝরণায় থামলাম। তখন বাজে দুপুর ২টার মতো। ১০ মাইল ঝরণাও চমৎকার প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত জায়গা। মূল সড়ক থেকে আধা কিলোমিটার ভেতরে এর অবস্থান। যেতে হয় চার/পাঁচটা ছোট ঝির পাড়ি দিয়ে। ঝরণাটা মোটামুটি বড় এবং পানির স্রোতও প্রবল। সেখানে দুপুরের স্নান সেরে নিলাম। ফ্রেশ হয়ে আমার আবার যখন সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম ততক্ষণে বিকেল সাড়ে ৩টা বেজে গেছে।

আমরা কয়েকজন আবার গাড়ির ছাদে উঠে বসলাম। আসলে, সাজেক ভ্যালি যাওয়ার পথে আসল মজাটাই পাওয়া যায় গাড়ির ছাদে। এখান থেকে পাহাড় যেমন দুচোখ জুড়িয়ে দেখা যায়, তেমনি আকাবাঁকা উঁচুনিচু সুদীর্ঘ পথের সৌন্দর্যও তৃপ্তি সহকারে অবলোকন করা যায়। বিকেল হওয়ায় সূর্যের উত্তাপ আমাদের তেমন ক্লান্ত করতে পারেনি। মেঘমিশ্রিত হিমেল বাতাস আর ধীরে ধীরে দিগন্তের কোলে ঢলে পড়া সূর্যের মিষ্টি রোদ্দুর আমাদের সফরকে আরো উপভোগ্য করে তুললো।
সাজেক ভ্যালি দীঘিনালার ১০ মাইল ঝরণা থেকেও প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর এই ৭০ কিলোমিটার পথের পুরোটাই দৃষ্টিনন্দন, প্রাকৃতিক শোভায় সজ্জিত। শহরে জীবনের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এই সবুজ পাহাড়ের মাঝে জীবনের যান্ত্রিকতা এক নিমিষেই হারিয়ে যায়, এমনই এক জাদুকরি শক্তি আছে এখান প্রকৃতির মাঝে। সাজেকে যাওয়ার পথে চাঁদের গাড়ির ছাদে বসে আমার কেবল একটি কথাই বারবার মনে হয়েছে, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো…’।

অবশেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমরা বাংলাদেশের দার্জেলিং, মেঘের দেশ, পাহাড়ারণ্যের ভূমি, দেশের সর্বোচ্চ সড়ক সাজেক ভ্যালিতে পৌঁছলাম। ততক্ষণে সূর্য বাড়ি ফিরে গেছে, পাখিরা নীড়ে ফিরছে, অন্ধকার গুটি গুটি পায়ে এসে তার কালো চাদর দিয়ে প্রকৃতিকে গুণ্ঠিত করছে।

সাজেক ভ্যালিতে তো পৌঁছানো গেল, কিন্তু থাকব কোথায়? থাকার জন্য রয়েছে রূনময় রির্সোট (বিজিবি পরিচালিত), সাজেক রির্সোট (সেনাবাহিনী পরিচালিত), আলোর রির্সোট এবং ক্লাব হাউস। সাজেক রিসোর্টে চারটি রুম আছে। চারটির ভাড়া যথাক্রমে ১০ হাজার, ৯ হাজার, ৮ হাজার ও ৭ হাজার টাকা। তবে পিক সিজন হওয়ায় কোনো রিসোর্টেই রুম খালি পেলাম না। অগত্যা স্থানীয়দের বাসায় ভাড়া থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তবে সমস্যা সেখানেও।

index-3
আমাদের দেশে বড় ছুটি বলতে দুই ঈদেই পাওয়া যায়। তাই ঈদের পর পরই পর্যটনস্পটগুলোতে পর্যটকদের ঢল নামে। এবার সাজেক ভ্যালিতেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো। তাই রিসোর্টে রুম না পেয়ে স্থানীয়দের বাসায় রুম ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করলাম। তবে সেখানেও সহসাই কোনো রুম ফাঁকা পাওয়া গেল না। বহু কষ্টে স্থানীয় প্রশাসক সিয়াতা লুসাইয়ের বাসায় রাত্রিযাপনের সুযোগ পেলাম। রুম ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা। আমরা চারজন এক রুমে উঠলাম।

রুমে উঠে ফ্রেশ হতে হতে রাত সাড়ে ৭টার মতো বেজে গেছে। ভাবলাম, কোথায় এলাম, জায়গাটা একটু ঘুরে দেখা দরকার। যেই ভাবা, সেই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম আমরা চারজন।

পূর্ণিমা রাত। ঘোমটাখসা চাঁদ। সন্ধ্যায় আঁধার যেভাবে ঘিরে ধরেছিল, সেই শৃঙ্খল থেকে পাহাড় ও সাজেক ভ্যালিকে মুক্তি দিয়েছে চাঁদ। সাজেকে বিদ্যুৎ আছে। তবে তা ব্যাটারিসৃষ্ট। সেই বিদ্যুৎ অবশ্য সাজেক রিসোর্ট থেকে ভ্যালির চার্চ পর্যন্ত লোকালয়ে সীমাবদ্ধ। এরপর সাজেক ভ্যালিতে বাসাবাড়িও খুব একটা নেই, তাই বিদ্যুৎও নেই; আছে শুধু অন্ধকার। অন্ধকার জায়গাটুকুতে জ্যোৎস্নায় সাজেকের সড়ক রূপালি ইলিশের মতো চকচক করছে। সেই সড়ক ধরেই চন্দ্রালোকিত রাতে আমরা হাঁটতে হাঁটতে হেলিকপ্টার প্যাড পর্যন্ত গেলাম।

হেলিকপ্টার প্যাডের আশপাশে অনেক খানি জায়গা জুড়ে সবুজ ঘাস। হেলিপ্যাডের পাশেই রয়েছে সূর্যঘড়ির স্থান। সেখানে তিনটি বেঞ্চ রয়েছে দর্শনার্থীদের বসার জন্য। চাঁদের আলোয় রূপালি স্নান সেরে নিতে আমরা সেই বেঞ্চগুলোতে বসলাম। নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে গান বেজে উঠলো, ‘এই মন জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি।। দেখ ওই ঝিলিমিলি চাঁদ সারারাত আকাশে শলমা জরি…।’

সাজেক ভ্যালির এখান থেকেই মেঘ সবচেয়ে ভাল দেখা যায়। আমরাও দেখলাম এক ঝাঁক উড়ন্ত মেঘপাখি। চাঁদের আলোয় অক্লান্ত সফেদ মেঘেরা অদৃশ্য ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এগিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে দৃষ্টির সীমানা পাড়ি দিয়ে অজানার উদ্দেশে।

হঠাৎ অনুভব করলাম, কেমন যেন শীত শীত লাগছে। দিনে আমরা যখন খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রা শুরু করি, তখন সূর্যের তেজে চোখ মেলা যাচ্ছিল না, প্রচণ্ড গরম ছিল। ভাদ্রের শেষে আশ্বিন মাস সবে শুরু। গরম থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক। রাতে একটু গরম কম থাকে, সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এ তো কাপুনি ধরিয়ে দেওয়ার মতো শীত।
পরে বুঝলাম, ঘটনাটা কী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে হওয়ায় সাজেক ভ্যালিতে আমরা মূলত মেঘের মাঝেই ছিলাম। তবে দূরের মেঘ চোখে পড়লেও কাছের মেঘ দেখা যায় না। তা ছাড়া, অনেক উঁচুতে হওয়ায় এখানে বাতাসও উন্মুক্ত ছিল। আর পাহাড়ি অঞ্চলেরও ধর্মই হলো দিনের বেলা গরম ও রাতের বেলা ঠান্ডা।

সূর্যঘড়ির স্থানটিতে ঘণ্টা খানেক সময় কাটিয়ে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম রাতের খাবারের জন্য। রিসোর্টে উঠতে না পারলে সাজেক ভ্যালিতে আপনাকে খাবারের জন্য স্থানীয় সস্তা হোটেলগুলোর মুখাপেক্ষী হতে হবে। সেক্ষেত্রে খাবারের অর্ডার দিতে হবে আগেই। আমাদেরও তা-ই হতো হয়েছিল। রাতে হাঁটতে বের হওয়ার আগে খাবারের অর্ডার দিয়ে বের হয়েছিলাম। আমরা সিয়াতা লুসাই দাকে বলে স্থানীয় একটি হোটেলে খাবারের অর্ডার কাটিয়েছিলাম। খাবারে দুই ধরনের আইটেম ছিল। মুরগি-ভাত ১৫০ টাকা। ডিম-ভাত ১০০ টাকা। আমরা যে যার পছন্দমতো অর্ডার দিয়েছিলাম।

খেতে গিয়ে নতুন দুটি জিনিসের স্বাদ পেলাম। এক, জুম চালের ভাত ও দুই বাঁশকড়ল। আমাদের খাবার পরিবেশন করল দুটি স্থানীয় উপজাতি মেয়ে- একটি ছো্ট্ট মেয়ে ও তার ভাবি। হোটেলটা তাদের পরিবারই চালায়। কী অমায়িক তাদের ব্যবহার! আমাদের সঙ্গে খাবার খেতে বসেছিল আরো ১৫/১৬ জন ছেলে। তারাও ঘুরতে এসেছে। এতগুলো মানুষকে একত্রে খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং সুশৃঙ্খলাভাবে খাবার পরিবেশন শেষ করলো। হিন্দি প্রবাদে বলে, ‘মেহমান ভগবান কি সমান হোতি হ্যায়’ অর্থাৎ ‘মেহমান হলো ভগবানের সমান’। তাদের খাতিরের কমতি রাখতে নেই। ওই মেয়ে দুটি বোধ হয়ে সেই মানসিকতা লালন করে।

খাবার শেষে আবার কিছুক্ষণ হেঁটে এস ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১১টা বেজে গেল। সূর্যোদয় দেখতে হলো ভোর সাড়ে ৪টায় উঠতে হবে। তাই একটু আগেভাগেই ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে লেপ ছাড়া ঘুমাতে পারলাম না!
পরদিন ভোরেই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সাজেক ভ্যালির সড়কে হাঁটতে লাগলাম। সূর্য উঠার আগেই আমরা উঠে পড়লাম। উদ্দেশ্য হ্যালিপ্যাড যাওয়া। সেখান থেকে সূর্যোদয়টা সব থেকে ভাল দেখা যায়। সাজেকের পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথটি খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মনে হয়, এখানেই ঘুমিয়ে থাকি। আমেরিকান লেখক ওয়াশিংটন আরভিংয়ের রূপকথার নায়ক রিপ ভ্যান উইনকেলের মতো। কেউ আমাকে না ডাকুক কয়েকটা বছর। একদিন না হয় জেগে দেখব, সময় বয়ে গেছে অনেকটা দূর। হয়তো রিপের মতো আমি বুড়িয়ে যাব। তবুও শহরের যান্ত্রিকতা, যন্ত্রণা আর কুৎসিত মানুষগুলোর ষড়যন্ত্রমূলক আচরণতো অন্তত পক্ষে সহ্য করতে হবে না!

হ্যালিপ্যাড যাওয়ার পথে বেশ উঁচু উঁচু কয়েকটা গাছ দেখলাম। এগুলো বৈলাম। দেশের সবচেয়ে দীর্ঘকায় গাছ। লম্বায় এরা সর্বোচ্চ ২৪০ ফুট পর্যন্ত হয়। সাজেকে রাতে দেখেছিলাম রূপালি আলোর ঝলকানি। উন্মুক্ত আকাশের বুকে অসংখ্য তারা আর পূর্ণিমার চাঁদের অপূর্ব আলোকসজ্জা। দিনে সূযের সোনালি আলোর অপেক্ষায় হা্ঁটতে লাগলাম। তবে ভোরে যতটুকু আলো ফুটেছে, তাতেই আবিষ্কার করলাম আরেক সাজেক ভ্যালি। সবুজ ও পাহাড়ের প্রাচুর্যে ঘেরা সাজেক ভ্যালি।

সাজেকে ঢেউ খেলানো অসংখ্য উঁচু-নিচু পাহাড়। যেগুলো সবুজ বনানীতে ঘেরা। চোখ জুড়ানো নিসর্গ। এটাকে মেঘপুরীর উপত্যকাও বলা যেতে পারে। পাহাড়ের প্রশস্ত বুক, আদিবাসীদের ঘর-বসতি ও নির্জন প্রকৃতির সঙ্গে দারুণ এক সখ্য আছে ভাসমান মেঘপুঞ্জের। পাহাড়ের বুক চিরে আপন মনে বয়ে চলেছে কাচালং ও মাচালং নামে ছোট দুটি নদী। নদী দুটির রূপ যেন সত্যিই পাহাড়ি কন্যার। দুটি নদীর বুকে প্রায় সব সময় ভাসতে দেখা যায় বাঁশের চালি, যা সবার দৃষ্টি কাড়ে। চালিতে বাঁধা বাঁশ সরাসরি চলে যায় কাপ্তাই লেক হয়ে কর্ণফুলি পেপার মিলে। আর পাহাড়ি পথ বেয়ে চলা রাস্তার দুধারে গড়ে উঠেছে স্থানীয় উপজাতীয়দের গ্রাম। সেসব গ্রামের জনমানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনধারা ঘিরে মুহূর্তেই আপ্লুত হয়ে ওঠে আগন্তুক পথচারীর আবেগ।

আসলে সাজেক ভ্যালির প্রকৃতি ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা ও রাতে বসে রঙের মেলা। সাজেকের আবহাওয়া ও সৌন্দর্য, রাতের আকাশে চন্দ্র-তারা ও দিনের আলোয় লাল সূর্য মিলেমিশে একাকার। এ দৃশ্য নিমিষেই সবার মনকে উদাস করে তোলে।

সূর্য ওঠার আগেই আমরা হেলিপ্যাডে গিয়ে পৌঁছলাম। আমাদের আগেই আরো অনেক লোক এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে সূর্যোদয় দেখার জন্য। আমাদের পরও আরো অনেক লোক এলো। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত সূর্যোদয়ের দেখা মিলল। দূরে সাজেকের চেয়েও উঁচু আরেকটি পাহাড়ের পেছন থেকে ধীরে ধীরে সূর্য আবির্ভূত হলো। সূর্যটা যেন ওই পাহাড়ের গুহায় সারা রাত লুকিয়ে ছিল। দিনের আলো ফুটতেই গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। মনে হলো, কোনো মহারাজ তার সিংহাসনে আসীন হলেন, আর আমরা সবাই তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। সাজেকে প্রথমবারের মতো আমরা দিনের আলোতে আমরা মেঘের চঞ্চল উড়াউড়ি দেখলাম।

পূর্ণিমা কিংবা সূর্যোদয় যখনই বলেন না কেন, প্রাকৃতিক শোভায় অনন্য সাজেক ভ্যালি। ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক কথায় যাকে বলে অনির্বচনীয়।

index-4

হ্যালিপ্যাডটা রুইলুই পাড়ার কাছাকাছিই অবস্থিত। রুইলুই পাড়াই সাজেক উপত্যকার মূল কেন্দ্র। এখানে লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। পাড়ার সবগুলো বাড়ির রং লাল–সবুজ। রুইলুই পাড়ার নিচ থেকে প্রধান উপত্যকার অংশ শুরু। দীর্ঘ পথ শেষ করে বহুদূরে দাঁড়িয়ে আছে মিজোরামের প্রাচীন সুউচ্চ পাহাড়ের শ্রেণি। রুইলুই পাড়া থেকে ২০ মিনিটের হাঁটা পথ কংলাক পাড়া। পাংখোয়াদের বসবাস এখানে। সব মিলিয়ে ১৫ পরিবারের বসবাস হবে। বিশাল পাথরখণ্ডের পাদদেশেই কংলাক পাড়ার অবস্থান। কংলাকের পাথরচূড়ায় দাঁড়িয়ে পুরো সাজেক উপত্যকা চমৎকারভাবে এক নজরে দেখা যায়। রুই রুই পাড়ার পাদদেশে দারুণ এক সংযোজন অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইল। হ্যালিপ্যাড থেকে সূর্যোদয় দেখার পর আমরা গেলাম অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইলে। সেখানেও রোমাঞ্চকর মুহূর্ত কাটালাম।

অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইল থেকে ফিরে আমরা গেলাম সাজেক ভ্যালিতে প্রবেশের গেটসংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন মন্দিরের পাশের একটি জায়গায়। সেখানে গিয়ে চোখে যা দেখলাম, অবিশ্বাস্য। আমরা ভেবেছিলাম, সাজেক ভ্যালির হ্যালিপ্যাড থেকে মেঘ সব চেয়ে ভাল দেখা যায়। তবে এখানে এসে আমাদের সেই ভুল ভেঙ্গে গেল। যা দেখলাম তাতে মনে হলো সাজেক ভ্যালি যে উদ্দেশ্যে আসা, পাহাড়ের ওপর সেই মেঘ দেখার তেষ্টা এবার পরিতৃপ্ত হলো। অনেকটা ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো আমার গেয়ে উঠতে ইচ্ছে হলো- ‘All at once I saw a crowd/A host of white clouds,/Above the valley, over the hills/Fluttering and dancing in the breeze..।’

সেখান থেকে ফিরে সকাল নাস্তা সেরে নিলাম সেই একই হোটেলে। এবারও ওই উপজাতিদের আতিথেয়তায় বিমুগ্ধ হলাম।

এবার যাওয়ার পালা। আমরা যে চাঁদের গাড়িটি রিসার্ভ নিয়ে এসেছিলাম সেটিতেই ফিরে যাব। ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বেলা ১১টার দিকে বের হলাম। আমরা যে ১৮ জন এসেছিলাম তাদের মধ্যে তিনজন সঙ্গী পেছনে পড়ে গিয়েছিল। তাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম ওই হোটেলটির সামনে। মনে হলো, একটা জিনিস ভুলে গেছি। এই পাহাড়ের মাঝে যারা আমাদের দুবেলা অন্নের ব্যবস্থা করলো তাদের ধন্যবাদটা তো অন্তত দেওয়া উচিত। গাড়ি থেকে নেমে হোটেলে গিয়ে ওই দুই উপজাতি কন্যার খোঁজ করলাম। ছোট্ট মেয়েটিকে পেলাম। তার ভাবিকে পেলাম না। নাম জেনে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। ইতিমধ্যে পেছনে পড়া তিনটি ছেলেও চলে এসেছে। গাড়ি ছেড়ে দিল। একদিনের ভ্রমণ শেষে আবার যাত্রা শুরু হলো প্রকৃতি ছেড়ে যান্ত্রিকতা পথে, প্রথমে খাগড়াছড়ি, তারপর ঢাকার উদ্দেশ্যে।

ঢাকায় আসার পর বন্ধু সাইফ খন্দকার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ছোট্ট মেয়েটির নাম কিরে?’ আমি বললাম, ‘মোয়ানি। অর্থ সান্ত্বনা। প্রকৃতির ছোঁয়ায় বেড়ে ওঠা মোয়ানির বড় অভাব আছে রে এই কংক্রিটের ঢাকা শহরে!

Comments

comments

X