বৃহস্পতিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, রাত ২:৩৫
শিরোনাম
Tuesday, September 5, 2017 3:46 am
A- A A+ Print

রোহিঙ্গাদের ঢল, সরকারে উদ্বেগ

মিয়ানমারের রাখাইনে দমন অভিযানের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল নামায় সরকার ‘কিছুটা চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ’ বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার কর্মকর্তাদের হিসাবে, রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর গত এগারো দিনে ৮৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। অবশ্য এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি বেলে স্থানীয়দের ধারণা।

তারা বলছেন, প্রথম দিকে রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হলেও বিজিবি এখন অঘোষিতভাবে সীমান্ত খুলে দিয়েছে। গত দুই দিনে কাউকে ফেরত পাঠানোর কথাও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।রাখাইনে সব হারিয়ে যারা বাংলাদেশে ঢুকেছেন, আরও বহু মানুষের পেছনে আসছে বলে জানাচ্ছেন তারা। রোহিঙ্গা মুসলমান ছাড়াও রাখাইনের হিন্দুরা আছেন তাদের মধ্যে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের এই ঢলের মধ্যেই সোমবার নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু বাজারের উল্টো দিকে সীমান্তের মিয়ানমারের অংশের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে বড় দুটো বিস্ফোরণ ঘটেছে; শোনা গেছে গুলির শব্দ।বিস্ফোরণে দুই পা হারানো ফাতেমা বেগম নামের এক নারীকে রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয়েছে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির হাসপাতালে। সীমান্তের ওই অংশে স্থলমাইন জাতীয় কোনো বিস্ফোরক পুঁতে রাখা হয়েছিল বলে বিজিবি কর্মকর্তাদের ধারণা।

বালুখালী এলাকার বাসিন্দা আবদুল গফুর জানান, বেলা ১১টা থেকে সীমান্তের খুব কাছে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় দিগন্তে সারা দিন উড়তে দেখা গেছে ঘন-কালো ধোঁয়া। সেখানে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে রোহিঙ্গাদের তথ্য।

এদিকে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী এবং টেকনাফের লেদা ও শাপলাপুরে আশ্রয় না পেয়ে উখিয়ার কুতুপালং থেকে শুরু করে থাইংখালী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাহাড়ি এলাকায় বৃহস্পতিবার থেকে চলছে রোহিঙ্গাদের বসতি গড়ার হিড়িক। টেকনাফের সীমান্তবর্তী হোয়াইক্যং ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও পাহাড়ের মাটি কেটে বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে সারি সারি ঝুপড়ি তৈরির দৃশ্য দেখা গেছে।
ওই ইউনিয়নের উনচিপ্রং এর পশ্চিমের পাহাড়ে রইক্ষ্যং এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন এক রোহিঙ্গা বস্তি। সেখানে পঞ্চাশ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন।

রোহিঙ্গাদের গড়ে তোলা নতুন বসতিগুলোতে কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও রইক্ষ্যং বস্তি এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন বিজিবি সদস্যরা।

টেকনাফে বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম বলেন, “কোনো না কোনোভাবে রোহিঙ্গারা আসছে। এ কারণে তাদের এক জায়গায় রেখে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি আমরা। এসব মানুষকে মানবিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে পরে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। ”স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, অনাহারে, অর্ধাহারে থাকা এই রোহিঙ্গারা যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে; সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই এর জের টানতে হবে।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলমগীর ফরহাদ বলেন, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা প্রতিদিনই আসছে। তবে গত ৪ দিনে পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া ও রহমতের বিল এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং, কাঞ্জরপাড়া, লম্বাবিল, খারাংখালী ও ঝিমংখালীসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটছে দলে দলে।পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা শরণার্থী শিবিরে জায়গা পাননি, তারা আশ্রয় নিচ্ছেন পালংখালীর তাজিমেরঘোনা, বালুরচর, বালুখালী, বাঘঘোনা ও আঞ্জুমান পাড়ার পাহাড়ী এলাকায়। আশপাশের গ্রাম, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঝোপ-জঙ্গলেও অবস্থান নিয়েছেন তারা।

“রোহিঙ্গারা যেভাবে পাহাড়ের যত্রতত্র আশ্রয় নিচ্ছে, তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় রাখা না গেলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।”

গত ২৪ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে পুলিশ পোস্ট ও সেনাক্যাম্পে হামলার পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের এই ঢল চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলা অনুপ্রবেশের ঘটনা কম ঘটলেও সন্ধ্যার পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে স্রোতের মত।রবি ও সোমবার উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রাণ বাঁচিয়ে সীমান্তের এপারে আসা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার শেষ নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা যতটা সম্ভব সহায়তা করছেন। তারপরও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা খাবার আর পানি ছাড়াই খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন পার করছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের মধ্যে ১৬ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশু রয়েছে। পাঁচ হাজার শিশুর বয়স পাঁচ বছরের নিচে। বহু শিশু আছে, যাদের সঙ্গে কোনো অভিভাবক নেই।

মিয়ানমারের মংডুর বলিবাজার এলাকা থেকে এসে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালীর পাহাদি এলাকায় পলিথিনের ঘর তুলেছেন মোহাম্মদ হোসেন নামের এক রোহিঙ্গা।তিনি বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তার ৩ সন্তানকে গুলি করে হত্যা করেছে। কোনো রকমে পালিয়ে আসতে পারলেও গত কয়েকদিন ধরে তারা অনাহারে-অর্ধাহারে রয়েছেন। কুতুপালং বা বালুখালী আশ্রয় শিবিরে জায়গা না পেয়ে পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন থাইংখালীর পাহাড়ে।
হোসেন জানান, অপরিচিত এক ব্যক্তি ঝুপড়ি বানানোর জন্য বাঁশ আর বড় একটি পলিথিন দিয়েছেন। কিন্তু হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই।

মিয়ানমারের ফকিরা বাজার থেকে আসা আব্দুল হাকিম জানান, বাংলাদেশে আসার পথে মিয়ামারের পাহাড়-জঙ্গলে খাবার না পেয়ে তাদের কলাগাছও খেতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশে ঢোকার পর স্থানীয় এক লোক কলা-বিস্কুট খেতে দিয়েছিলেন। কোথাও জায়গা না পেয়ে তারা এই পাহাড়ে এসেছেন।কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা এই রোহিঙ্গাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাদের মনে।
পালংখালী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, “এমনিতেই আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নানা অপরাধে জড়িত। এখন নতুন করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নিজেদের মত করে বসতি গড়ে তুলছে। এর ফলে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।”

বিজিবি-২ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল বলেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের রইক্ষ্যং পাহাড়ে এক জায়গায় রাখতে তাদের মধ্যে থেকেই স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজিবির উদ্যোগে খোলা হয়েছে চিকিৎসা ক্যাম্প।

তবে স্থানীয় প্রশাসনের মুখপাত্র ক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ বলছেন, রইক্ষ্যং পাহাড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প বানানোর বিষয়টি বিজিবির নিজস্ব উদ্যোগ। এর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

গত ১১ দিনে কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাবও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি জানাতে পারেননি।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত থাকায় সরকার ‘কিছুটা চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ’। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, মানবিক সহায়তার অবস্থা এবং মিয়ানমারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। মালদ্বীপ বলছে, তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সব রকম অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছে।

Comments

Comments!

 Natunsokal.com

রোহিঙ্গাদের ঢল, সরকারে উদ্বেগ

Tuesday, September 5, 2017 3:46 am

মিয়ানমারের রাখাইনে দমন অভিযানের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল নামায় সরকার ‘কিছুটা চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ’ বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার কর্মকর্তাদের হিসাবে, রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর গত এগারো দিনে ৮৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। অবশ্য এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি বেলে স্থানীয়দের ধারণা।

তারা বলছেন, প্রথম দিকে রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হলেও বিজিবি এখন অঘোষিতভাবে সীমান্ত খুলে দিয়েছে। গত দুই দিনে কাউকে ফেরত পাঠানোর কথাও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।রাখাইনে সব হারিয়ে যারা বাংলাদেশে ঢুকেছেন, আরও বহু মানুষের পেছনে আসছে বলে জানাচ্ছেন তারা। রোহিঙ্গা মুসলমান ছাড়াও রাখাইনের হিন্দুরা আছেন তাদের মধ্যে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের এই ঢলের মধ্যেই সোমবার নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু বাজারের উল্টো দিকে সীমান্তের মিয়ানমারের অংশের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে বড় দুটো বিস্ফোরণ ঘটেছে; শোনা গেছে গুলির শব্দ।বিস্ফোরণে দুই পা হারানো ফাতেমা বেগম নামের এক নারীকে রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয়েছে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির হাসপাতালে। সীমান্তের ওই অংশে স্থলমাইন জাতীয় কোনো বিস্ফোরক পুঁতে রাখা হয়েছিল বলে বিজিবি কর্মকর্তাদের ধারণা।

বালুখালী এলাকার বাসিন্দা আবদুল গফুর জানান, বেলা ১১টা থেকে সীমান্তের খুব কাছে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় দিগন্তে সারা দিন উড়তে দেখা গেছে ঘন-কালো ধোঁয়া। সেখানে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে রোহিঙ্গাদের তথ্য।

এদিকে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী এবং টেকনাফের লেদা ও শাপলাপুরে আশ্রয় না পেয়ে উখিয়ার কুতুপালং থেকে শুরু করে থাইংখালী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাহাড়ি এলাকায় বৃহস্পতিবার থেকে চলছে রোহিঙ্গাদের বসতি গড়ার হিড়িক। টেকনাফের সীমান্তবর্তী হোয়াইক্যং ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও পাহাড়ের মাটি কেটে বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে সারি সারি ঝুপড়ি তৈরির দৃশ্য দেখা গেছে।
ওই ইউনিয়নের উনচিপ্রং এর পশ্চিমের পাহাড়ে রইক্ষ্যং এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন এক রোহিঙ্গা বস্তি। সেখানে পঞ্চাশ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানাচ্ছেন।

রোহিঙ্গাদের গড়ে তোলা নতুন বসতিগুলোতে কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও রইক্ষ্যং বস্তি এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন বিজিবি সদস্যরা।

টেকনাফে বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম বলেন, “কোনো না কোনোভাবে রোহিঙ্গারা আসছে। এ কারণে তাদের এক জায়গায় রেখে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি আমরা। এসব মানুষকে মানবিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে পরে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। ”স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, অনাহারে, অর্ধাহারে থাকা এই রোহিঙ্গারা যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে; সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই এর জের টানতে হবে।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলমগীর ফরহাদ বলেন, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা প্রতিদিনই আসছে। তবে গত ৪ দিনে পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া ও রহমতের বিল এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং, কাঞ্জরপাড়া, লম্বাবিল, খারাংখালী ও ঝিমংখালীসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটছে দলে দলে।পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা শরণার্থী শিবিরে জায়গা পাননি, তারা আশ্রয় নিচ্ছেন পালংখালীর তাজিমেরঘোনা, বালুরচর, বালুখালী, বাঘঘোনা ও আঞ্জুমান পাড়ার পাহাড়ী এলাকায়। আশপাশের গ্রাম, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঝোপ-জঙ্গলেও অবস্থান নিয়েছেন তারা।

“রোহিঙ্গারা যেভাবে পাহাড়ের যত্রতত্র আশ্রয় নিচ্ছে, তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় রাখা না গেলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।”

গত ২৪ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে পুলিশ পোস্ট ও সেনাক্যাম্পে হামলার পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের এই ঢল চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলা অনুপ্রবেশের ঘটনা কম ঘটলেও সন্ধ্যার পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে স্রোতের মত।রবি ও সোমবার উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রাণ বাঁচিয়ে সীমান্তের এপারে আসা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার শেষ নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা যতটা সম্ভব সহায়তা করছেন। তারপরও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা খাবার আর পানি ছাড়াই খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন পার করছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের মধ্যে ১৬ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশু রয়েছে। পাঁচ হাজার শিশুর বয়স পাঁচ বছরের নিচে। বহু শিশু আছে, যাদের সঙ্গে কোনো অভিভাবক নেই।

মিয়ানমারের মংডুর বলিবাজার এলাকা থেকে এসে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালীর পাহাদি এলাকায় পলিথিনের ঘর তুলেছেন মোহাম্মদ হোসেন নামের এক রোহিঙ্গা।তিনি বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তার ৩ সন্তানকে গুলি করে হত্যা করেছে। কোনো রকমে পালিয়ে আসতে পারলেও গত কয়েকদিন ধরে তারা অনাহারে-অর্ধাহারে রয়েছেন। কুতুপালং বা বালুখালী আশ্রয় শিবিরে জায়গা না পেয়ে পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন থাইংখালীর পাহাড়ে।
হোসেন জানান, অপরিচিত এক ব্যক্তি ঝুপড়ি বানানোর জন্য বাঁশ আর বড় একটি পলিথিন দিয়েছেন। কিন্তু হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই।

মিয়ানমারের ফকিরা বাজার থেকে আসা আব্দুল হাকিম জানান, বাংলাদেশে আসার পথে মিয়ামারের পাহাড়-জঙ্গলে খাবার না পেয়ে তাদের কলাগাছও খেতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশে ঢোকার পর স্থানীয় এক লোক কলা-বিস্কুট খেতে দিয়েছিলেন। কোথাও জায়গা না পেয়ে তারা এই পাহাড়ে এসেছেন।কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা এই রোহিঙ্গাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাদের মনে।
পালংখালী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, “এমনিতেই আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নানা অপরাধে জড়িত। এখন নতুন করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নিজেদের মত করে বসতি গড়ে তুলছে। এর ফলে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।”

বিজিবি-২ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল বলেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের রইক্ষ্যং পাহাড়ে এক জায়গায় রাখতে তাদের মধ্যে থেকেই স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজিবির উদ্যোগে খোলা হয়েছে চিকিৎসা ক্যাম্প।

তবে স্থানীয় প্রশাসনের মুখপাত্র ক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ বলছেন, রইক্ষ্যং পাহাড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প বানানোর বিষয়টি বিজিবির নিজস্ব উদ্যোগ। এর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

গত ১১ দিনে কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাবও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি জানাতে পারেননি।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত থাকায় সরকার ‘কিছুটা চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ’। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, মানবিক সহায়তার অবস্থা এবং মিয়ানমারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। মালদ্বীপ বলছে, তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সব রকম অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছে।

Comments

comments

X