শনিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১২:৩১
শিরোনাম
Wednesday, February 10, 2016 6:11 am | আপডেটঃ February 10, 2016 8:20 AM
A- A A+ Print

মাহফুজ আনামের স্বীকারোক্তি ও অভিযুক্ত সাংবাদিকতা

পুলক ঘটক : গ্রেফতারকৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেখানে কোনও সাংবাদিক উপস্থিত থাকে না। জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামী কি বলেছে তা কেবল ঐ ব্যক্তি এবং জিজ্ঞাসবাদকারী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ জানে না। অথচ জিজ্ঞাসাবাদে আসামী কি কি তথ্য প্রকাশ করেছে তা সংবাদপত্রে ছাপা হয়। এই বক্তব্য মূলত পুলিশের বক্তব্য। এর সত্যতা ভিন্নসূত্র থেকে যাচাই-বাছাই করার কোনও অবকাশ নেই। সত্যতা যাচাই বাছাই না করেই তা সংবাদ আকারে বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়। এভাবেই চলছে আমাদের সাংবাদিকতা। এরকম দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার দায় স্বীকার করে ফেঁসে গেছেন মাহফুজ আনাম।

ডেইলি স্টারের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বুধবার রাতে এটিএন নিউজে এক অনুষ্ঠানে সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছিলেন যে, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ের সরবরাহ করা ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর’ যাচাই ছাড়া প্রকাশ করে তিনি ভুল করেছিলেন। তিনি বলেন, “এটা আমার সাংবাদিকতার জীবনে, সম্পাদক হিসেবে ভুল, এটা একটা বিরাট ভুল। সেটা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি।”

মাহফুজ আনাম যে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন, সেটা অতীতের ঘটনা। একই ধরণের অপরাধ তিনি এখনও করছেন, প্রতি নিয়ত করছেন। সংবাদপত্রের, সাংবাদিকের এবং সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনামদের সেই দায়িত্বহীনতার খন্ডচিত্র শেষের দিকে উপস্থাপন করব।

গত ৫ ফেব্রুয়ারী (শুক্রবার) রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় উভয়েই ডেইলি স্টার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি কথা বলেছেন ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত পত্রিকাটির রজত জয়ন্তি উৎসবে, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী পুত্র বক্তব্য দিয়েছেন ফেসবুকে।

রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে পার্থক্যের কথা মনে করিয়ে দেন। একপেশে নয়, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আপনারা সরকারের, এমনকি আমার নিজেরও সমালোচনা করুন। তবে সেই সমালোচনা যেনো হয় তথ্যভিত্তিক। কোনভাবেই যেনো একপেশে না হয়।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণ গণতন্ত্রের জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এসব অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। বাইরের কেউ যাতে গণমাধ্যমের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সৎ সাহস সাংবাদিকদের থাকতে হবে।

পক্ষান্তরে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে। ফেসবুকে জয় লিখেছেন, “একটি প্রধান সংবাদপত্রের সম্পাদক সামরিক বিদ্রোহে উস্কানি দিতে যে মিথ্যা সাজানো প্রচারণা চালায় তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। মাহফুজ আনাম, দ্যা ডেইলি স্টার সম্পাদক, স্বীকার করেছেন যে তিনি আমার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অপবাদ আরোপ করতেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির গল্প ছাপিয়েছিলেন। তিনি সামরিক স্বৈরশাসনের সমর্থনে আমার মাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে এই কাজ করেছিলেন। তিনি অব্যাহতভাবে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তাদের অনৈতিকতা এবং দুর্নীতিগ্রস্থ হবার কথা লিখেন। তার নিজের স্বীকারোক্তি মতে তিনি নিজেই পুরোপুরি অনৈতিক এবং একজন মিথ্যাবাদী। তার অবশ্যই একজন সাংবাদিক হিসেবে থাকার কোন অধিকার নাই, সম্পাদক তো অনেক দূরের বিষয়। তার কার্যক্রম দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে; যা দেশপ্রেমহীন এবং বাংলাদেশ বিরোধী।আমার ব্যক্তিগত মত, তার মিথ্যা গল্পের উস্কানি আমার মাকে গ্রেফতার করিয়েছে এবং ১১ মাস তিনি জেলে কাটিয়েছেন। আমি বিচার চাই। আমি চাই মাহফুজ আনাম আটক হোক এবং তার রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার হোক।”

এরপর রবীবার জাতীয় সংসদ গরম হয়ে উঠল। সাতজন এমপি’র কন্ঠে প্রধানমন্ত্রী পুত্রের বক্তব্যের প্রতিধ্বনী শোনা গেল। তবে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য কোনও সাংসদ শুনেছেন - এমনটি মনে হলনা। বিশ্বস্ততায়, অভিজ্ঞতায়, প্রজ্ঞায় ও দক্ষতায় শাণীত রাষ্ট্রের অভিভাবকের বক্তব্য একজন অবসরপ্রাপ্ত অবহেলিত বৃদ্ধ পিতার বক্তব্যের মতই উপেক্ষিত হল। জয়ের বক্তব্য কোনও মামলায় সংক্ষুব্ধ বাদীর বক্তব্যের অনুরুপ। তার মা গ্রেফতার হয়েছিলেন বলে তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি বিচার প্রার্থী। তার বক্তব্যে ক্ষোভ আছে; রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা নেই। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পুরোটাই দায়িত্বশীলতা মন্ডিত।

জয় তার ক্ষোভের জায়গা থেকে ডেইলি স্টার ও এর সম্পাদককে অভিযু্ক্ত করেছেন। একই অভিযোগে বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্র, সরকারী ও বেসরকারী মালিকানায় পরিচালিত রেডিও ও টেলিভিশনসমূহ, সম্পাদক, সাংবাদিকবৃন্দ ও কর্মকর্তাবৃন্দ আসামী। ডেইলি স্টার একা নয়। সরকারে ও রাজনীতিতে নবীন সজীব ওয়াজেদ জয় হয়তো বিষয়টি তলিয়ে দেখেননি। তিনি তলিয়ে দেখেননি যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেসময়ের প্রতিবেদনগুলির পেছনে কত মানুষ ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। বিশেষত: সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই - যারা এই সংবাদগুলো গণমাধ্যমকে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তারা কি তাদের সেই কর্মের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবেন? সরকারী টেলিভিশনে যা প্রচার করা হয়েছে তার জন্য সেখানকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ কি অভিযুক্ত হবেন?

সর্বোপরি সংবাদপত্রে যাদের বরাত দিয়ে দুর্নীতির সংবাদগুলো ছাপা হয়েছে তাদের কি হবে? সেইসব রাজনীতিক, যারা গ্রেফতারকৃত অবস্থায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কথাগুলো বলেছেন, তারাতো এখন সংসদেই অবস্থান করছেন। তারা সরকারে রয়েছেন। যারা গ্রেফতার অবস্থায় চাপের মুখে শেখ হাসিনার নাম বলেছেন তাদের না হয় ক্ষমা করলেন। যারা সেসময় গ্রেফতার হয়নি তাদের কথাবার্তা ও ভূমিকাকে কিভাবে দেখবেন?

যেসব নেতা সেনা সমর্থিত সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছিল, যারা আওয়ামীলীগ ও বিএনপি ভাঙতে চেয়েছিল, “মাইনাস টু” বাস্তবায়নের কাজ করছিল, তাদের কি হবে? সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান/অপ্রধান কর্তা ব্যক্তিদের কি হবে?
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অনেকগুলো সেনা শাসনের অভিজ্ঞতা নিয়েছে। অনেক সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সেনা শাসনের দালালি করেছে - এটা যেমন ঠিক, তেমনি সেনাশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুন:রুদ্ধারে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার গৌরবোজ্জল ভূমিকা রয়েছে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দেশে সামরিক শাসন চলছিল। এ অবস্থায় ২৩ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিল এরপর থেকে সেনাবাহিনীর কোনও সংবাদ পরিবেশন করা হবে না। আর্মি শাসনে থেকে, আর্মির বন্দুকের নলের মুখোমুখী দাড়িয়ে সাংবাদিক নেতাদের এরকম এক্টিভিজমের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আর কোথাও আছে কিনা আমি জানি না।

২৫ মার্চের কালো রাতে জাতীয় প্রেসক্লাব, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক ও ডেইলি পিপলস পত্রিকা সেনাবাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়। পত্রিকা অফিসগুলো জালিয়ে দেয় হয়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। দৈনিক বাংলা মোরে সেনা ট্যাংকের পাহাড়া বসে। ফলে পাকিস্তান অবজার্ভার, পাকিস্তান টাইমস, ও দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা অফিসে বন্দী হয়ে পড়েন সাংবাদিক কর্মচারীরা। ২৫ মার্চ থেকে পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ২৯ মার্চ থেকে অবজারভার এবং দৈনিক পূর্বদেশসহ কয়েকটি পত্রিকার প্রকাশনা আবারও চালু করতে অবরুদ্ধ সাংবাদিকদের বাধ্য করেছিল দখলদার আর্মি। অর্থাৎ পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর বক্তব্য ছাপানোর জন্য পত্রিকার প্রকাশনা চালু রাখতে হবে। ঐ সময় বুদ্ধিজীবি হত্যা প্রকল্পের খলনায়ক যুদ্ধাপরাধী আশরাফুজ্জামান খান এবং চৌধুরী মাইনুদ্দিনরা যেমন পাকিস্তানের পক্ষে সাংবাদিতা করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষের বেশ কিছু সাংবাদিককে পাকিস্তানের পক্ষে লিখতে হয়েছে। ২৯ মার্চ সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতি বাংলা ও ইংরেজিতে তৈরি করে দেয়ার কাজটি হয়েছিল পাকিস্তান অজারভার ও দৈনিক পূর্বদেশ কার্যালয়ে। অবজারভারের প্রেসেই সেটা ছাপানো হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দু’জন সাংবাদিককে সহস্তে সেই কাজটি করতে হয়েছিল। তারা ততক্ষণ এই কাজ করেছেন, যতক্ষণ পালাতে পারেননি। মাস খানিক পর তারা পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। সেনা শাসনে অবরুদ্ধ থেকে ঐ কয়েকদিন তারা যে সাংবাদিকতা করেছেন, তাকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব? তারা কি দেশদ্রোহি? সেনা শাসনের মধ্যে সাংবাদিকতা ও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশে সাংবাদিকতা কি একই ভাবে মূল্যায়ন করা যায়?

জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের সময় পিআইডি ও আইএসপিআরের তত্ত্বাবধানে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তাদের প্রেসক্রিপশনে কাজ করতে হয়েছে সাংবাদিকদের। এসময় সামরিক শাসনের উৎসাহী সমর্থক সাংবাদিকতায় ছিলনা তা নয়। অনেক সাংবাদিক দালালি করেছেন, অনেকেই সুদিনের অপেক্ষায় ছিলেন। স্বৈর শাসনের মধ্যেই অনেকে সাহসী সাংবাদিকতা করেছেন। কেউ স্বৈর শাসকের মন্ত্রী হয়েছেন, সুবিধা নিয়েছেন কেউ আবার গণতন্ত্র পুনরোদ্ধারের লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ্যভাবে সামিল হয়েছেন। সর্বশেষ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলেও এমনটি হয়েছে। এই সময়ে প্রকাশনার উপর সামরিক বাহিনীর অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপ ছিলোনা। তবে গ্রেফতারকৃত রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের র্দুনীতির খবরগুলো সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দাদের কাছ থেকেই আসত এবং পত্রিকায় তা প্রকাশিত হত।

সামরিক হস্তক্ষেপের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা ও গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সাংবাদিকতার এই ইতিহাসে কিছু সাংবাদিক হিরো, কিছু সাংবাদিক ভিলেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার এই অধ্যায়ে মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানদের ভূমিকাকে ইতিহাস কিভাবে মূল্যয়ন করবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে এই ইতিহাসে তারা শক্তিশালী উপাদান হিসেবে গুরুত্ব পাবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মাহফুজ আনাম অতীত অপসাংবাদিকতার একটি ঘটনায় দায় স্বীকার করলেও একই ধরণের কাজ এখনও করছেন। শুধু তিনি নন, সকল সম্পাদক প্রতিনিয়ত একই কাজ করে চলেছেন । এটা তারা স্বেচ্ছায় করছেন, অথবা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এরকম একটির কথা বলব।

গ্রেফতারকৃত আসামীদের ক্রসফায়ারে মৃত্যু একসময় প্রতিদিন ঘটত। কোনও আসামী গ্রেফতার হলে তাকে আজ রাতেই ক্রসফায়ারে দেয়া হবে, না আগামীকাল ক্রসফায়ারে দেয়া হবে তা নিয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা গল্পগুজব করতেন। অর্থাৎ ক্রসফায়ার যে হবে তা আগেভাগেই জানা। পরদিন শুধু গল্পটা লিখতে হবে। সংবাদপত্রে ক্রস ফায়ারের বহু খবর ছাপা হয়েছে; এখনও হয়। এসব খবরের গল্পগুলো প্রায় অভিন্ন। পুলিশ বা র্যা ব যা বলে সংবাদপত্রে তাই ছাপা হয়। ঘটনাটি কি রকম ছিল, তা সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে জানতে পারেন না। বিএনপি আমলে আওয়ামীলীগ নেতারা অভিযোগ করতেন, ক্রসফায়ারের নামে পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। এখন বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন। অনেক আসামী আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের অভিযোগ আদালতে নথিভুক্ত অভিযোগ। সাধারণ মানুষও মনে করে ক্রসফায়ার মূলত: পরিকল্পিত হত্যা। এসব “পরিকল্পিত হত্যার” সংবাদ আমরা পরিবেশন করি “ক্রসফায়ার” হিসেবে এবং কোনও প্রকার তদন্ত ছাড়া। এটা আমাদের নিত্যদিনের সাংবাদিকতা।

একজন গ্রেফতারকৃত আসামীকে রাতের বেলা কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা যদি সাংবাদিকরা অনুসরণ করত তাহলে ক্রসফায়ার কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পরত। যদি ১০টি টেলিভিশনের ক্যামেরা আসামী বহনকারী গাড়িকে অনুসরণ করে, যদি ৫০ জন সাংবাদিক পিছু নেয় তাহলে গোপনে ক্রসফায়ার কার্যকর কিভাবে সম্ভব হবে? র‌্যাব বা পুলিশ যদি ক্রসফায়ারের নামে আসলেই দায়িত্বহীন কিছু করে থাকে, তাহলে আমরা সাংবাদিকরা কি আমাদের দায়িত্বটি পুরোপুরি পালন করছি ? আমরা কি এর দায় এড়াতে পারি? এখানে সাংবাদিকের পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেনা? কিন্তু বড় প্রশ্ন হল, আমরা কি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছি? সরকারের বাহিনীগুলো কি আমাদের এই দায়িত্বটি পালন করতে দেবে? আমি বলব, আমরা কিছুটা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছি, এবং কিছুটা বাধ্য হয়ে। সম্পাদকরা যদি সিরিয়াসলি ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো অনুসরণ করার জন্য সাংবাদিকদের দায়িত্ব দেয় তাহলে অধিকাংশ ক্রসফায়ারের ভিডিও চিত্র ক্যামেরায় ধরা পরবে এবং ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা পত্রিকায় ছাপা হবে। বড় বড় যুদ্ধের চিত্র যদি সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পরে, তবে ক্রসফায়ারের চিত্র ধরা পড়বেনা কেন? তারপরও কথা আছে। সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করলেই কি সেটা টেলিভিশন সম্প্রচার করতে পারবে? সাংবাদিকরা প্রত্যক্ষ্য করলেই তার বিবরণ কি পত্রিকার পাতায় ছাপানো যাবে? আমাদের সাংবাদিকতা কি এতটাই স্বাধীন ?

আমি সাংবাদিককে যদি তার দায়িত্ব অবহেলার জন্য কিংবা ভুল সাংবাদিকতার জন্য আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করাতে চাই, তাহলে এর সবগুলো দিক বিবেচনায় নিতে হবে। সাংবাদিকতায় ভুল স্বীকারের পরিপ্রেক্ষিতে ডেইলি স্টার পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া এবং এর সম্পাদক মাহফুজ আনামকে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর দাবি ভবিষ্যতেও করা যাবে। তার আগে আসুন আত্ম সমালোচনা করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় আমাদের সমালোচনা করুন। সাংসদবৃন্দ আমাদের সমালোচনা করুন। আমাদের বলুন, আমরা যেন অপসাংবাদিকতা বন্ধ করি। আমাদের আস্বস্ত করুন, আমরা সাহসিকতার সাথে ক্রসফায়ারের প্রকৃত কাহিনী টেলিভিশনে ও পত্রিকায় তুলে ধরে নিরাপদে থাকতে পারব। কেউ আমাদের কোনও খতি করতে পারবে না।

এবার “নীতিনিষ্ঠ” সাংবাদিক সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলে এই লেখা শেষ করব। ডেইলি স্টার ও এর সম্পাদকের উপর রাজপুত্র অসন্তুষ্ট আছেন। তিনি তাকে রাস্ট্রদ্রোহের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলাতে চান। এটা বাস্তবায়নের জন্য সব তেলমর্দক সরব হয়ে গেছেন। মাহফুজ আনাম তার অতীত সাংবাদিকতার ত্রুটি স্বীকার করেছেন। এটাই মওকা। প্রমাণ হয়ে গেছে, তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ সম্পাদক এবং ডেইলি স্টার বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ পত্রিকা। বাকি সব পত্রিকা নীতিনিষ্ঠ। আমাদের কিছু কিছু নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিক বগল বাজাচ্ছেন। ডেইলি স্টার বন্ধ করে দিতে হবে। সম্পাদককে ফাঁসি দিতে হবে! এ এক ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত।

প্রিয় ভাল পত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ, আমাদের মত বশংবদদের পিঠেই স্বৈরতন্ত্র সওয়ার হয় এবং মজবুত হয়ে বসার পর আমাদেরই কারও পিঠে খুটি গেড়ে দেয়। সওয়ারির মহিমা-মাধুর্যে বিগলিত কিছু গর্ধব আহ্লাদে কিছুদিন জাবর কাটে। কেউ খেয়ে জাবর কাটে, কেউ না খেয়ে জাবর কাটে। যতদূর রাস্তা প্রশস্ত ও মসৃণ ততদূর পর্যন্ত মনিবকে বহন করে চলে। সামনে চড়াই উৎরাই দেখলে মনিবের ভারটা বেশি মনে হয়। কেউ তারাতারি নেতিয়ে পরে, কেউ তখন খুড়িয়ে হাটে। সামনে বাঘ-সিংহের দেখা মিললে মনিবকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলে দৌর দেয়।

মনিবের মহিমায় গর্বিত হয়ে জাবরকাটা গর্ধবগুলোর উপর নির্ভর করে সরকার প্রধানরা অনেক সময় ভূল করে বসেন। যার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। অতীতে এরকম ভুলের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এরকম ভুল করা যাবে না। সাংবাদিকতার যেসব ত্রুটি রয়েছে সেসব কাটিয়ে উঠতে হবে। সংবাদপত্র বন্ধ করা বা সম্পাদককে হেনস্তা করা ভুল সাংবাদিকতার সমাধান নয়।

Comments

Comments!

 Natunsokal.com

মাহফুজ আনামের স্বীকারোক্তি ও অভিযুক্ত সাংবাদিকতা

Wednesday, February 10, 2016 6:11 am | আপডেটঃ February 10, 2016 8:20 AM

পুলক ঘটক : গ্রেফতারকৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেখানে কোনও সাংবাদিক উপস্থিত থাকে না। জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামী কি বলেছে তা কেবল ঐ ব্যক্তি এবং জিজ্ঞাসবাদকারী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ জানে না। অথচ জিজ্ঞাসাবাদে আসামী কি কি তথ্য প্রকাশ করেছে তা সংবাদপত্রে ছাপা হয়। এই বক্তব্য মূলত পুলিশের বক্তব্য। এর সত্যতা ভিন্নসূত্র থেকে যাচাই-বাছাই করার কোনও অবকাশ নেই। সত্যতা যাচাই বাছাই না করেই তা সংবাদ আকারে বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়। এভাবেই চলছে আমাদের সাংবাদিকতা। এরকম দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার দায় স্বীকার করে ফেঁসে গেছেন মাহফুজ আনাম।

ডেইলি স্টারের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বুধবার রাতে এটিএন নিউজে এক অনুষ্ঠানে সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছিলেন যে, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ের সরবরাহ করা ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর’ যাচাই ছাড়া প্রকাশ করে তিনি ভুল করেছিলেন। তিনি বলেন, “এটা আমার সাংবাদিকতার জীবনে, সম্পাদক হিসেবে ভুল, এটা একটা বিরাট ভুল। সেটা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি।”

মাহফুজ আনাম যে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন, সেটা অতীতের ঘটনা। একই ধরণের অপরাধ তিনি এখনও করছেন, প্রতি নিয়ত করছেন। সংবাদপত্রের, সাংবাদিকের এবং সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনামদের সেই দায়িত্বহীনতার খন্ডচিত্র শেষের দিকে উপস্থাপন করব।

গত ৫ ফেব্রুয়ারী (শুক্রবার) রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় উভয়েই ডেইলি স্টার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি কথা বলেছেন ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত পত্রিকাটির রজত জয়ন্তি উৎসবে, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী পুত্র বক্তব্য দিয়েছেন ফেসবুকে।

রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে পার্থক্যের কথা মনে করিয়ে দেন। একপেশে নয়, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আপনারা সরকারের, এমনকি আমার নিজেরও সমালোচনা করুন। তবে সেই সমালোচনা যেনো হয় তথ্যভিত্তিক। কোনভাবেই যেনো একপেশে না হয়।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণ গণতন্ত্রের জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এসব অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। বাইরের কেউ যাতে গণমাধ্যমের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সৎ সাহস সাংবাদিকদের থাকতে হবে।

পক্ষান্তরে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে। ফেসবুকে জয় লিখেছেন, “একটি প্রধান সংবাদপত্রের সম্পাদক সামরিক বিদ্রোহে উস্কানি দিতে যে মিথ্যা সাজানো প্রচারণা চালায় তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। মাহফুজ আনাম, দ্যা ডেইলি স্টার সম্পাদক, স্বীকার করেছেন যে তিনি আমার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অপবাদ আরোপ করতেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির গল্প ছাপিয়েছিলেন। তিনি সামরিক স্বৈরশাসনের সমর্থনে আমার মাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে এই কাজ করেছিলেন। তিনি অব্যাহতভাবে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তাদের অনৈতিকতা এবং দুর্নীতিগ্রস্থ হবার কথা লিখেন। তার নিজের স্বীকারোক্তি মতে তিনি নিজেই পুরোপুরি অনৈতিক এবং একজন মিথ্যাবাদী। তার অবশ্যই একজন সাংবাদিক হিসেবে থাকার কোন অধিকার নাই, সম্পাদক তো অনেক দূরের বিষয়। তার কার্যক্রম দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে; যা দেশপ্রেমহীন এবং বাংলাদেশ বিরোধী।আমার ব্যক্তিগত মত, তার মিথ্যা গল্পের উস্কানি আমার মাকে গ্রেফতার করিয়েছে এবং ১১ মাস তিনি জেলে কাটিয়েছেন। আমি বিচার চাই। আমি চাই মাহফুজ আনাম আটক হোক এবং তার রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার হোক।”

এরপর রবীবার জাতীয় সংসদ গরম হয়ে উঠল। সাতজন এমপি’র কন্ঠে প্রধানমন্ত্রী পুত্রের বক্তব্যের প্রতিধ্বনী শোনা গেল। তবে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য কোনও সাংসদ শুনেছেন – এমনটি মনে হলনা। বিশ্বস্ততায়, অভিজ্ঞতায়, প্রজ্ঞায় ও দক্ষতায় শাণীত রাষ্ট্রের অভিভাবকের বক্তব্য একজন অবসরপ্রাপ্ত অবহেলিত বৃদ্ধ পিতার বক্তব্যের মতই উপেক্ষিত হল। জয়ের বক্তব্য কোনও মামলায় সংক্ষুব্ধ বাদীর বক্তব্যের অনুরুপ। তার মা গ্রেফতার হয়েছিলেন বলে তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি বিচার প্রার্থী। তার বক্তব্যে ক্ষোভ আছে; রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা নেই। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পুরোটাই দায়িত্বশীলতা মন্ডিত।

জয় তার ক্ষোভের জায়গা থেকে ডেইলি স্টার ও এর সম্পাদককে অভিযু্ক্ত করেছেন। একই অভিযোগে বাংলাদেশের সকল সংবাদপত্র, সরকারী ও বেসরকারী মালিকানায় পরিচালিত রেডিও ও টেলিভিশনসমূহ, সম্পাদক, সাংবাদিকবৃন্দ ও কর্মকর্তাবৃন্দ আসামী। ডেইলি স্টার একা নয়। সরকারে ও রাজনীতিতে নবীন সজীব ওয়াজেদ জয় হয়তো বিষয়টি তলিয়ে দেখেননি। তিনি তলিয়ে দেখেননি যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেসময়ের প্রতিবেদনগুলির পেছনে কত মানুষ ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। বিশেষত: সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই – যারা এই সংবাদগুলো গণমাধ্যমকে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তারা কি তাদের সেই কর্মের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবেন? সরকারী টেলিভিশনে যা প্রচার করা হয়েছে তার জন্য সেখানকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ কি অভিযুক্ত হবেন?

সর্বোপরি সংবাদপত্রে যাদের বরাত দিয়ে দুর্নীতির সংবাদগুলো ছাপা হয়েছে তাদের কি হবে? সেইসব রাজনীতিক, যারা গ্রেফতারকৃত অবস্থায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কথাগুলো বলেছেন, তারাতো এখন সংসদেই অবস্থান করছেন। তারা সরকারে রয়েছেন। যারা গ্রেফতার অবস্থায় চাপের মুখে শেখ হাসিনার নাম বলেছেন তাদের না হয় ক্ষমা করলেন। যারা সেসময় গ্রেফতার হয়নি তাদের কথাবার্তা ও ভূমিকাকে কিভাবে দেখবেন?

যেসব নেতা সেনা সমর্থিত সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছিল, যারা আওয়ামীলীগ ও বিএনপি ভাঙতে চেয়েছিল, “মাইনাস টু” বাস্তবায়নের কাজ করছিল, তাদের কি হবে? সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান/অপ্রধান কর্তা ব্যক্তিদের কি হবে?
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অনেকগুলো সেনা শাসনের অভিজ্ঞতা নিয়েছে। অনেক সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সেনা শাসনের দালালি করেছে – এটা যেমন ঠিক, তেমনি সেনাশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুন:রুদ্ধারে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার গৌরবোজ্জল ভূমিকা রয়েছে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দেশে সামরিক শাসন চলছিল। এ অবস্থায় ২৩ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিল এরপর থেকে সেনাবাহিনীর কোনও সংবাদ পরিবেশন করা হবে না। আর্মি শাসনে থেকে, আর্মির বন্দুকের নলের মুখোমুখী দাড়িয়ে সাংবাদিক নেতাদের এরকম এক্টিভিজমের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আর কোথাও আছে কিনা আমি জানি না।

২৫ মার্চের কালো রাতে জাতীয় প্রেসক্লাব, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক ও ডেইলি পিপলস পত্রিকা সেনাবাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়। পত্রিকা অফিসগুলো জালিয়ে দেয় হয়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। দৈনিক বাংলা মোরে সেনা ট্যাংকের পাহাড়া বসে। ফলে পাকিস্তান অবজার্ভার, পাকিস্তান টাইমস, ও দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা অফিসে বন্দী হয়ে পড়েন সাংবাদিক কর্মচারীরা। ২৫ মার্চ থেকে পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ২৯ মার্চ থেকে অবজারভার এবং দৈনিক পূর্বদেশসহ কয়েকটি পত্রিকার প্রকাশনা আবারও চালু করতে অবরুদ্ধ সাংবাদিকদের বাধ্য করেছিল দখলদার আর্মি। অর্থাৎ পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর বক্তব্য ছাপানোর জন্য পত্রিকার প্রকাশনা চালু রাখতে হবে। ঐ সময় বুদ্ধিজীবি হত্যা প্রকল্পের খলনায়ক যুদ্ধাপরাধী আশরাফুজ্জামান খান এবং চৌধুরী মাইনুদ্দিনরা যেমন পাকিস্তানের পক্ষে সাংবাদিতা করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষের বেশ কিছু সাংবাদিককে পাকিস্তানের পক্ষে লিখতে হয়েছে। ২৯ মার্চ সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতি বাংলা ও ইংরেজিতে তৈরি করে দেয়ার কাজটি হয়েছিল পাকিস্তান অজারভার ও দৈনিক পূর্বদেশ কার্যালয়ে। অবজারভারের প্রেসেই সেটা ছাপানো হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দু’জন সাংবাদিককে সহস্তে সেই কাজটি করতে হয়েছিল। তারা ততক্ষণ এই কাজ করেছেন, যতক্ষণ পালাতে পারেননি। মাস খানিক পর তারা পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। সেনা শাসনে অবরুদ্ধ থেকে ঐ কয়েকদিন তারা যে সাংবাদিকতা করেছেন, তাকে আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব? তারা কি দেশদ্রোহি? সেনা শাসনের মধ্যে সাংবাদিকতা ও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশে সাংবাদিকতা কি একই ভাবে মূল্যায়ন করা যায়?

জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের সময় পিআইডি ও আইএসপিআরের তত্ত্বাবধানে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তাদের প্রেসক্রিপশনে কাজ করতে হয়েছে সাংবাদিকদের। এসময় সামরিক শাসনের উৎসাহী সমর্থক সাংবাদিকতায় ছিলনা তা নয়। অনেক সাংবাদিক দালালি করেছেন, অনেকেই সুদিনের অপেক্ষায় ছিলেন। স্বৈর শাসনের মধ্যেই অনেকে সাহসী সাংবাদিকতা করেছেন। কেউ স্বৈর শাসকের মন্ত্রী হয়েছেন, সুবিধা নিয়েছেন কেউ আবার গণতন্ত্র পুনরোদ্ধারের লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ্যভাবে সামিল হয়েছেন। সর্বশেষ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলেও এমনটি হয়েছে। এই সময়ে প্রকাশনার উপর সামরিক বাহিনীর অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপ ছিলোনা। তবে গ্রেফতারকৃত রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের র্দুনীতির খবরগুলো সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দাদের কাছ থেকেই আসত এবং পত্রিকায় তা প্রকাশিত হত।

সামরিক হস্তক্ষেপের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা ও গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সাংবাদিকতার এই ইতিহাসে কিছু সাংবাদিক হিরো, কিছু সাংবাদিক ভিলেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার এই অধ্যায়ে মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানদের ভূমিকাকে ইতিহাস কিভাবে মূল্যয়ন করবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে এই ইতিহাসে তারা শক্তিশালী উপাদান হিসেবে গুরুত্ব পাবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মাহফুজ আনাম অতীত অপসাংবাদিকতার একটি ঘটনায় দায় স্বীকার করলেও একই ধরণের কাজ এখনও করছেন। শুধু তিনি নন, সকল সম্পাদক প্রতিনিয়ত একই কাজ করে চলেছেন । এটা তারা স্বেচ্ছায় করছেন, অথবা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এরকম একটির কথা বলব।

গ্রেফতারকৃত আসামীদের ক্রসফায়ারে মৃত্যু একসময় প্রতিদিন ঘটত। কোনও আসামী গ্রেফতার হলে তাকে আজ রাতেই ক্রসফায়ারে দেয়া হবে, না আগামীকাল ক্রসফায়ারে দেয়া হবে তা নিয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা গল্পগুজব করতেন। অর্থাৎ ক্রসফায়ার যে হবে তা আগেভাগেই জানা। পরদিন শুধু গল্পটা লিখতে হবে। সংবাদপত্রে ক্রস ফায়ারের বহু খবর ছাপা হয়েছে; এখনও হয়। এসব খবরের গল্পগুলো প্রায় অভিন্ন। পুলিশ বা র্যা ব যা বলে সংবাদপত্রে তাই ছাপা হয়। ঘটনাটি কি রকম ছিল, তা সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে জানতে পারেন না। বিএনপি আমলে আওয়ামীলীগ নেতারা অভিযোগ করতেন, ক্রসফায়ারের নামে পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। এখন বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন। অনেক আসামী আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের অভিযোগ আদালতে নথিভুক্ত অভিযোগ। সাধারণ মানুষও মনে করে ক্রসফায়ার মূলত: পরিকল্পিত হত্যা। এসব “পরিকল্পিত হত্যার” সংবাদ আমরা পরিবেশন করি “ক্রসফায়ার” হিসেবে এবং কোনও প্রকার তদন্ত ছাড়া। এটা আমাদের নিত্যদিনের সাংবাদিকতা।

একজন গ্রেফতারকৃত আসামীকে রাতের বেলা কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা যদি সাংবাদিকরা অনুসরণ করত তাহলে ক্রসফায়ার কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পরত। যদি ১০টি টেলিভিশনের ক্যামেরা আসামী বহনকারী গাড়িকে অনুসরণ করে, যদি ৫০ জন সাংবাদিক পিছু নেয় তাহলে গোপনে ক্রসফায়ার কার্যকর কিভাবে সম্ভব হবে? র‌্যাব বা পুলিশ যদি ক্রসফায়ারের নামে আসলেই দায়িত্বহীন কিছু করে থাকে, তাহলে আমরা সাংবাদিকরা কি আমাদের দায়িত্বটি পুরোপুরি পালন করছি ? আমরা কি এর দায় এড়াতে পারি? এখানে সাংবাদিকের পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেনা? কিন্তু বড় প্রশ্ন হল, আমরা কি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছি? সরকারের বাহিনীগুলো কি আমাদের এই দায়িত্বটি পালন করতে দেবে? আমি বলব, আমরা কিছুটা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছি, এবং কিছুটা বাধ্য হয়ে। সম্পাদকরা যদি সিরিয়াসলি ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো অনুসরণ করার জন্য সাংবাদিকদের দায়িত্ব দেয় তাহলে অধিকাংশ ক্রসফায়ারের ভিডিও চিত্র ক্যামেরায় ধরা পরবে এবং ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা পত্রিকায় ছাপা হবে। বড় বড় যুদ্ধের চিত্র যদি সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পরে, তবে ক্রসফায়ারের চিত্র ধরা পড়বেনা কেন? তারপরও কথা আছে। সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করলেই কি সেটা টেলিভিশন সম্প্রচার করতে পারবে? সাংবাদিকরা প্রত্যক্ষ্য করলেই তার বিবরণ কি পত্রিকার পাতায় ছাপানো যাবে? আমাদের সাংবাদিকতা কি এতটাই স্বাধীন ?

আমি সাংবাদিককে যদি তার দায়িত্ব অবহেলার জন্য কিংবা ভুল সাংবাদিকতার জন্য আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করাতে চাই, তাহলে এর সবগুলো দিক বিবেচনায় নিতে হবে। সাংবাদিকতায় ভুল স্বীকারের পরিপ্রেক্ষিতে ডেইলি স্টার পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া এবং এর সম্পাদক মাহফুজ আনামকে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর দাবি ভবিষ্যতেও করা যাবে। তার আগে আসুন আত্ম সমালোচনা করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় আমাদের সমালোচনা করুন। সাংসদবৃন্দ আমাদের সমালোচনা করুন। আমাদের বলুন, আমরা যেন অপসাংবাদিকতা বন্ধ করি। আমাদের আস্বস্ত করুন, আমরা সাহসিকতার সাথে ক্রসফায়ারের প্রকৃত কাহিনী টেলিভিশনে ও পত্রিকায় তুলে ধরে নিরাপদে থাকতে পারব। কেউ আমাদের কোনও খতি করতে পারবে না।

এবার “নীতিনিষ্ঠ” সাংবাদিক সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলে এই লেখা শেষ করব। ডেইলি স্টার ও এর সম্পাদকের উপর রাজপুত্র অসন্তুষ্ট আছেন। তিনি তাকে রাস্ট্রদ্রোহের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলাতে চান। এটা বাস্তবায়নের জন্য সব তেলমর্দক সরব হয়ে গেছেন। মাহফুজ আনাম তার অতীত সাংবাদিকতার ত্রুটি স্বীকার করেছেন। এটাই মওকা। প্রমাণ হয়ে গেছে, তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ সম্পাদক এবং ডেইলি স্টার বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ পত্রিকা। বাকি সব পত্রিকা নীতিনিষ্ঠ। আমাদের কিছু কিছু নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিক বগল বাজাচ্ছেন। ডেইলি স্টার বন্ধ করে দিতে হবে। সম্পাদককে ফাঁসি দিতে হবে! এ এক ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত।

প্রিয় ভাল পত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ, আমাদের মত বশংবদদের পিঠেই স্বৈরতন্ত্র সওয়ার হয় এবং মজবুত হয়ে বসার পর আমাদেরই কারও পিঠে খুটি গেড়ে দেয়। সওয়ারির মহিমা-মাধুর্যে বিগলিত কিছু গর্ধব আহ্লাদে কিছুদিন জাবর কাটে। কেউ খেয়ে জাবর কাটে, কেউ না খেয়ে জাবর কাটে। যতদূর রাস্তা প্রশস্ত ও মসৃণ ততদূর পর্যন্ত মনিবকে বহন করে চলে। সামনে চড়াই উৎরাই দেখলে মনিবের ভারটা বেশি মনে হয়। কেউ তারাতারি নেতিয়ে পরে, কেউ তখন খুড়িয়ে হাটে। সামনে বাঘ-সিংহের দেখা মিললে মনিবকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলে দৌর দেয়।

মনিবের মহিমায় গর্বিত হয়ে জাবরকাটা গর্ধবগুলোর উপর নির্ভর করে সরকার প্রধানরা অনেক সময় ভূল করে বসেন। যার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। অতীতে এরকম ভুলের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এরকম ভুল করা যাবে না। সাংবাদিকতার যেসব ত্রুটি রয়েছে সেসব কাটিয়ে উঠতে হবে। সংবাদপত্র বন্ধ করা বা সম্পাদককে হেনস্তা করা ভুল সাংবাদিকতার সমাধান নয়।

Comments

comments

X