শনিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১:১৬
শিরোনাম
Monday, January 11, 2016 9:19 am
A- A A+ Print

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন ও মর্যাদার লড়াই

মো.আরিফুল ইসলাম : সদ্য ঘোষিত ৮ম বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের অমর্যাদা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবের পর থেকেই আন্দোলন করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ইতিমধ্যে শিক্ষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে সকল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দাবি মেনে নেওয়া না হলে আগামী ১১ তারিখ থেকে দেশের ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচারের চেষ্টা করছি।

এক.
৭ম বেতন কাঠামোয় মুখ্য সচিব, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সচিবরা সর্বোচ্চ ধাপ গ্রেড-১ এ বেতন পেতেন। ৮ম বেতন কাঠামোয় পূর্বের সর্বোচ্চ গ্রেড-১ থেকে শিক্ষকদের দু’ধাপ নিচে নামানো হয়েছে এবং উপরের দিকে অতিরিক্ত দুটি বেতনের ধাপ সৃষ্টি করা হয়েছে মন্ত্রীপরিষদ সচিব/মুখ্য ও সিনিয়র সচিবদের জন্য। এদিক থেকে বেতন কাঠামোয় ধাপ হলো ২২ টি এবং গ্রেড হলো ২০ টি। বর্তমানে গ্রেড-১ ও ২ এ যথাক্রমে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব বেতন-ভাতা পাবেন। শিক্ষক ও যুগ্ম সচিবদের জন্য রাখা হয়েছে ৩ নম্বর গ্রেড। কিন্তু ৭ম বেতন কাঠামোয় মন্ত্রীপরিষদ সচিব, মুখ্যসচিব ও সচিবদের মতো শিক্ষকরাও ছিলেন ১ নম্বরে। ফলে ক্রমিক হিসেব করলে ৩য় গ্রেড নিয়ে শিক্ষকরা নেমে গেলেন ৫ম নম্বরে। উল্লেখ্য, ধাপ ও গ্রেড এক কথা নয়।

দুই.
৮ম বেতন কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল রাখা হয়নি অথচ তা ৭ম বেতন কাঠামোয় ছিলো। ফলে শেষ জীবনেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পক্ষে ১ম ও ২য় ধাপ তো দুরের কথা ৩য় ও ৪র্থ (গ্রেড-১ ও ২) ধাপের অধীনে বেতন পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ক্রমিক হিসেবে নতুন বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের মর্যাদা ১ম থেকে কমে ৫ম নম্বরে অর্থাৎ ৩য় গ্রেডে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষকরা দু’ধাপ নিচে নেমেছেন দেখা গেলেও আসলে শিক্ষকদের নিচে নামানো হয়েছে ৪ ধাপ। অর্থাৎ ৫ম ধাপে শিক্ষকরা সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা পাবেন।

সুতরাং আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচারে কঠিন সমীকরণ দেখানোর প্রয়োজন নেই। খুব সহজেই বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন শতভাগ যৌক্তিক।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় শতভাগ বেতন বেড়েছে। তাই স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বিষয়টি এখন আর আন্দোলনের মূল বিষয় নয় বলে আমি মনে করি।

শুরু থেকে আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিলো না। তবে ইদানিং আন্দোলনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মানুষ মতামত প্রকাশ করছেন। যাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় বলতেই হয়।

এক.
অপ্রিয় হলেও বলতে হয়, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এমন মতামতের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক শিক্ষকই দায়ী। যাঁদের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যা কখনোই কাম্য নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে দেয়াল তৈরির খেসারত হিসেবেই এমনটা হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমি মনে করছি, শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে এ বিষয়টি অন্যতম একটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

দুই.
দীর্ঘদিন আন্দোলনের পর মাঝপথে থেমে যাওয়া, আন্দোলনে দু’একজন শিক্ষক নেতার ফেইসবুকে সেলফি প্রকাশ এবং আন্দোলনের তীর্থস্থান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করার পর থেকে শিক্ষক ফেডারেশনের প্রতি অনেকেই এখন আস্থা রাখতে পারছেন না। ফলাফল হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ আন্দোলন নিয়ে বিরূপ মতামত প্রকাশ করছেন।

তিন.
শিক্ষক আন্দোলনের মূল বিষয়টি সম্পর্কে এখনো অধিকাংশ মানুষ শতভাগ অবগত নন। বেশিরভাগ মানুষ এখনো মনে করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সকল শিক্ষকই এখন থেকে সচিবদের সমান বেতন চাইছেন। অর্থাৎ তারা মনে করছেন প্রভাষক থেকে শুরু করে অধ্যাপক পর্যন্ত সকল শিক্ষকদেরকেই সচিবদের সমান বেতন দিতে হবে। যেমনিভাবে গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষ মনে করেন কলেজের শিক্ষক মানেই প্রফেসর। ফলে আন্দোলনের বিরুদ্ধে অনেককেই মতামত দিতে দেখা যাচ্ছে।

যাই হোক, নিজেদের দাবি আদায়ে এসব বিষয় সম্পর্কে আমাদের সন্মানিত শিক্ষক ও শিক্ষক ফেডারেশন নেতাদের আরো সচেতন হতে হবে।

এবার আসি শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়ে। আমরা অনেকেই মনে করছি শিক্ষকদের তো আমরা সন্মান কম করি না, তাহলে এতো বেতন দিয়ে উনারা কি করবেন? আসলে শিক্ষকদের আন্দোলন বেতন বা টাকার জন্য নয়, তা মানতেই হবে। এ আন্দোলন মর্যাদা টিকিয়ে রাখার লড়াই। কতিপয় সচিবের সুপারিশে বর্তমান সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমনটি করা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সমাজে শিক্ষকদের আমরা যতই সন্মান দেই না কেন, কাগজে-কলমে কিন্তু তাঁদের মর্যাদা কমেছে। যা শিক্ষক সমাজ তথা পুরো জাতির জন্য লজ্জাজনক! পাঠক সমাজের কাছে প্রশ্ন রইলো, সমাজে সবার উপরে মর্যাদা দেব অথচ বেতনের বেলায় কেন প্রাপ্য গ্রেড থেকে নিচে দেব? ৮ম বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের ধাপ ও গ্রেড কমানোর এমন কি দরকার ছিলো?

মনে রাখতে হবে, একজন সচিব হতে যেমন জীবনের সকল কয়লা পুড়াতে হয় তেমনি একজন অধ্যাপক হতে হলেও তিন মাথা এক সাথে করতে হয়। এক একজন অধ্যাপক রাষ্ট্রের জন্য এক একটি রত্ন স্বরূপ। আমি সচিবদের ছোট করছি না। সচিবরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। সচিবদের বেতন কাঠামো নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের হাতে গড়া একজন সচিবের মর্যাদা কীভাবে একজন অধ্যাপকের চেয়ে বেশি হয়? নতুন তৈরি দু’টি ধাপ না হয় বাদই দিলাম। এরপরেও সচিবরা যদি ক্রমিক হিসেবে অতিরিক্ত দু’টি ধাপ এবং গ্রেড-১ ও ২ এর অধীনে বেতন-ভাতা পান, কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা পাবেন না?

শুধু মুখে-মুখে সম্মান দিলেইতো হবে না। শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান ও যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন দিতে হবে। কাগজে-কলমে শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে জানি, অনেক শিক্ষার্থীই আমার সঙ্গে আজ একমত হবেন না। কারণ, কিছু সংখ্যক শিক্ষকের কারণে শিক্ষকদের প্রতি অনেক শিক্ষার্থীরই ক্ষোভ, রাগ ও অভিমান রয়েছে। তা ছিলো, আছে এবং থাকবে। এ ক্ষোভ, অভিমান আমারও মাঝে মাঝে হয়। কিন্তু তা যে সবই আবেগ এবং বয়সের দোষ তার প্রমাণ হলো, দিন শেষে শিক্ষকদের দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়।

আমি মনে করি এর জন্য নতুন করে বেতন কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল চালু করার মাধ্যমেও এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। অন্য সবার প্রতি এখন আর আমাদের বিশ্বাস নেই। সমস্যা সমাধানে দেশের মানুষ এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে চেয়ে আছে। আশা করি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের প্রয়োজন হবে না। এর আগেই তিনি শিক্ষকদের বিষয়টি বিবেচনায় এনে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

সারাংশঃ একটি ক্লাসে রহিম, করিম, জাহিদ এবং রানা এই চার জন শিক্ষার্থী প্রথম বেঞ্চে বসতো। তারা চার জনই ছিলো এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থী। একদিন নতুন দু’টি অতিরিক্ত বেঞ্চ তৈরি করে রহিম ও করিম সামনে গিয়ে নতুন বেঞ্চে বসলো। এরপর জাহিদকে আগের বেঞ্চে বহাল রেখে রানাকে আগের বেঞ্চ থেকে দু’বেঞ্চ পেছনে গিয়ে বসতে বলা হলো। অর্থাৎ প্রথম বেঞ্চের ছাত্র রানা এখন পঞ্চম বেঞ্চের ছাত্র।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

Comments!

 Natunsokal.com

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন ও মর্যাদার লড়াই

Monday, January 11, 2016 9:19 am

মো.আরিফুল ইসলাম : সদ্য ঘোষিত ৮ম বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের অমর্যাদা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবের পর থেকেই আন্দোলন করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ইতিমধ্যে শিক্ষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে সকল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দাবি মেনে নেওয়া না হলে আগামী ১১ তারিখ থেকে দেশের ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচারের চেষ্টা করছি।

এক.
৭ম বেতন কাঠামোয় মুখ্য সচিব, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সচিবরা সর্বোচ্চ ধাপ গ্রেড-১ এ বেতন পেতেন। ৮ম বেতন কাঠামোয় পূর্বের সর্বোচ্চ গ্রেড-১ থেকে শিক্ষকদের দু’ধাপ নিচে নামানো হয়েছে এবং উপরের দিকে অতিরিক্ত দুটি বেতনের ধাপ সৃষ্টি করা হয়েছে মন্ত্রীপরিষদ সচিব/মুখ্য ও সিনিয়র সচিবদের জন্য। এদিক থেকে বেতন কাঠামোয় ধাপ হলো ২২ টি এবং গ্রেড হলো ২০ টি। বর্তমানে গ্রেড-১ ও ২ এ যথাক্রমে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব বেতন-ভাতা পাবেন। শিক্ষক ও যুগ্ম সচিবদের জন্য রাখা হয়েছে ৩ নম্বর গ্রেড। কিন্তু ৭ম বেতন কাঠামোয় মন্ত্রীপরিষদ সচিব, মুখ্যসচিব ও সচিবদের মতো শিক্ষকরাও ছিলেন ১ নম্বরে। ফলে ক্রমিক হিসেব করলে ৩য় গ্রেড নিয়ে শিক্ষকরা নেমে গেলেন ৫ম নম্বরে। উল্লেখ্য, ধাপ ও গ্রেড এক কথা নয়।

দুই.
৮ম বেতন কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল রাখা হয়নি অথচ তা ৭ম বেতন কাঠামোয় ছিলো। ফলে শেষ জীবনেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পক্ষে ১ম ও ২য় ধাপ তো দুরের কথা ৩য় ও ৪র্থ (গ্রেড-১ ও ২) ধাপের অধীনে বেতন পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ক্রমিক হিসেবে নতুন বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের মর্যাদা ১ম থেকে কমে ৫ম নম্বরে অর্থাৎ ৩য় গ্রেডে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষকরা দু’ধাপ নিচে নেমেছেন দেখা গেলেও আসলে শিক্ষকদের নিচে নামানো হয়েছে ৪ ধাপ। অর্থাৎ ৫ম ধাপে শিক্ষকরা সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা পাবেন।

সুতরাং আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচারে কঠিন সমীকরণ দেখানোর প্রয়োজন নেই। খুব সহজেই বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন শতভাগ যৌক্তিক।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় শতভাগ বেতন বেড়েছে। তাই স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বিষয়টি এখন আর আন্দোলনের মূল বিষয় নয় বলে আমি মনে করি।

শুরু থেকে আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিলো না। তবে ইদানিং আন্দোলনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মানুষ মতামত প্রকাশ করছেন। যাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় বলতেই হয়।

এক.
অপ্রিয় হলেও বলতে হয়, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এমন মতামতের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক শিক্ষকই দায়ী। যাঁদের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যা কখনোই কাম্য নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে দেয়াল তৈরির খেসারত হিসেবেই এমনটা হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমি মনে করছি, শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে এ বিষয়টি অন্যতম একটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

দুই.
দীর্ঘদিন আন্দোলনের পর মাঝপথে থেমে যাওয়া, আন্দোলনে দু’একজন শিক্ষক নেতার ফেইসবুকে সেলফি প্রকাশ এবং আন্দোলনের তীর্থস্থান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করার পর থেকে শিক্ষক ফেডারেশনের প্রতি অনেকেই এখন আস্থা রাখতে পারছেন না। ফলাফল হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ আন্দোলন নিয়ে বিরূপ মতামত প্রকাশ করছেন।

তিন.
শিক্ষক আন্দোলনের মূল বিষয়টি সম্পর্কে এখনো অধিকাংশ মানুষ শতভাগ অবগত নন। বেশিরভাগ মানুষ এখনো মনে করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সকল শিক্ষকই এখন থেকে সচিবদের সমান বেতন চাইছেন। অর্থাৎ তারা মনে করছেন প্রভাষক থেকে শুরু করে অধ্যাপক পর্যন্ত সকল শিক্ষকদেরকেই সচিবদের সমান বেতন দিতে হবে। যেমনিভাবে গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষ মনে করেন কলেজের শিক্ষক মানেই প্রফেসর। ফলে আন্দোলনের বিরুদ্ধে অনেককেই মতামত দিতে দেখা যাচ্ছে।

যাই হোক, নিজেদের দাবি আদায়ে এসব বিষয় সম্পর্কে আমাদের সন্মানিত শিক্ষক ও শিক্ষক ফেডারেশন নেতাদের আরো সচেতন হতে হবে।

এবার আসি শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়ে। আমরা অনেকেই মনে করছি শিক্ষকদের তো আমরা সন্মান কম করি না, তাহলে এতো বেতন দিয়ে উনারা কি করবেন? আসলে শিক্ষকদের আন্দোলন বেতন বা টাকার জন্য নয়, তা মানতেই হবে। এ আন্দোলন মর্যাদা টিকিয়ে রাখার লড়াই। কতিপয় সচিবের সুপারিশে বর্তমান সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমনটি করা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সমাজে শিক্ষকদের আমরা যতই সন্মান দেই না কেন, কাগজে-কলমে কিন্তু তাঁদের মর্যাদা কমেছে। যা শিক্ষক সমাজ তথা পুরো জাতির জন্য লজ্জাজনক! পাঠক সমাজের কাছে প্রশ্ন রইলো, সমাজে সবার উপরে মর্যাদা দেব অথচ বেতনের বেলায় কেন প্রাপ্য গ্রেড থেকে নিচে দেব? ৮ম বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের ধাপ ও গ্রেড কমানোর এমন কি দরকার ছিলো?

মনে রাখতে হবে, একজন সচিব হতে যেমন জীবনের সকল কয়লা পুড়াতে হয় তেমনি একজন অধ্যাপক হতে হলেও তিন মাথা এক সাথে করতে হয়। এক একজন অধ্যাপক রাষ্ট্রের জন্য এক একটি রত্ন স্বরূপ। আমি সচিবদের ছোট করছি না। সচিবরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। সচিবদের বেতন কাঠামো নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের হাতে গড়া একজন সচিবের মর্যাদা কীভাবে একজন অধ্যাপকের চেয়ে বেশি হয়? নতুন তৈরি দু’টি ধাপ না হয় বাদই দিলাম। এরপরেও সচিবরা যদি ক্রমিক হিসেবে অতিরিক্ত দু’টি ধাপ এবং গ্রেড-১ ও ২ এর অধীনে বেতন-ভাতা পান, কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা পাবেন না?

শুধু মুখে-মুখে সম্মান দিলেইতো হবে না। শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান ও যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন দিতে হবে। কাগজে-কলমে শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে জানি, অনেক শিক্ষার্থীই আমার সঙ্গে আজ একমত হবেন না। কারণ, কিছু সংখ্যক শিক্ষকের কারণে শিক্ষকদের প্রতি অনেক শিক্ষার্থীরই ক্ষোভ, রাগ ও অভিমান রয়েছে। তা ছিলো, আছে এবং থাকবে। এ ক্ষোভ, অভিমান আমারও মাঝে মাঝে হয়। কিন্তু তা যে সবই আবেগ এবং বয়সের দোষ তার প্রমাণ হলো, দিন শেষে শিক্ষকদের দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়।

আমি মনে করি এর জন্য নতুন করে বেতন কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল চালু করার মাধ্যমেও এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। অন্য সবার প্রতি এখন আর আমাদের বিশ্বাস নেই। সমস্যা সমাধানে দেশের মানুষ এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে চেয়ে আছে। আশা করি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের প্রয়োজন হবে না। এর আগেই তিনি শিক্ষকদের বিষয়টি বিবেচনায় এনে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

সারাংশঃ একটি ক্লাসে রহিম, করিম, জাহিদ এবং রানা এই চার জন শিক্ষার্থী প্রথম বেঞ্চে বসতো। তারা চার জনই ছিলো এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থী। একদিন নতুন দু’টি অতিরিক্ত বেঞ্চ তৈরি করে রহিম ও করিম সামনে গিয়ে নতুন বেঞ্চে বসলো। এরপর জাহিদকে আগের বেঞ্চে বহাল রেখে রানাকে আগের বেঞ্চ থেকে দু’বেঞ্চ পেছনে গিয়ে বসতে বলা হলো। অর্থাৎ প্রথম বেঞ্চের ছাত্র রানা এখন পঞ্চম বেঞ্চের ছাত্র।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

comments

X