সোমবার, ২১শে মে, ২০১৮ ইং, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৩:০০
শিরোনাম
Friday, March 17, 2017 8:26 am | আপডেটঃ March 17, 2017 8:31 AM
A- A A+ Print

নিজ বাসার দরজায় নারী ব্যাংক কর্মকর্তা খুন

রাজধানীর সেন্ট্রাল রোড সংলগ্ন ১৩ ওয়েস্টএন্ড স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবনের নিচতলা। সিঁড়ির কাছটা রক্তে মাখামাখি। পাছে পা লেগে যায়—এই আশঙ্কায় খুব সাবধানে এগোচ্ছিলেন ভবনের দুই বাসিন্দা। চোখে চোখ পড়তেই বললেন, এই বাসাতেই আরিফা থাকতেন। উনিই খুন হয়েছেন সকালে। এই জায়গাটাতেই।

যমুনা ব্যাংকের কর্মকর্তা আরিফুন্নেসা আরিফা গতকাল সকাল নয়টায় কাজে বের হচ্ছিলেন। দরজা খুলে বের হওয়ার পর দুপাও এগোতে পারেননি। তার আগেই গলায় ছুরি চালিয়ে সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন তাঁকে খুন করেন বলে অভিযোগ স্বজনদের। ফখরুল ইসলাম এর আগেও আরিফাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন সরাসরি এবং মুঠোফোনে। সবশেষ ফেসবুকে আরিফার বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনকেও ‘বাঁচতে দেবেন না’ বলে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আরিফার পরিবার ফখরুলের বিরুদ্ধে মাস ছয়েক আগে কলাবাগান থানায় জিডিও করে।

আরিফার গ্রামের বাড়ি জামালপুর শহরে। ফখরুলদের বাড়িও ওই একই শহরে। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস ডিপার্টমেন্টের কর্মী ফখরুল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা পড়েন।
আরিফার ভাই আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে আরিফা সবচেয়ে ছোট। ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করার পর তিনি প্রথমে সিটি ব্যাংকে চাকরি নেন। গত এপ্রিলে যোগ দেন যমুনা ব্যাংকে। ফখরুলের সঙ্গে বিয়েতে পরিবারের লোকজনের অমত থাকায় আরিফা ‘নিজেই বিয়ে করে ফেলেন’। কিন্তু তাঁর বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। নানা ছুতায় ফখরুল গায়ে হাত তুলতেন। এমনকি রাস্তার ওপর পরিচিতজনদের সামনেও একাধিকবার তাঁকে প্রহার করেছেন।

আবদুল্লাহ আল আমিন আরও বলেন, বিয়ের বছরখানেকের মাথায় একবার আরিফা তালাকের জন্য উকিল নোটিশ পাঠান। ফখরুল প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি আর মারপিট করবেন না। আরিফা ফিরে যান। কিন্তু আবারও ফখরুল নির্যাতন শুরু করেন। সাত-আট মাস আগে আরিফা তালাক দেন ফখরুলকে। এরপর থেকেই আরিফাকে হুমকি দিতে শুরু করেন ফখরুল। ছয় মাস আগে আরিফার পরিবারের লোকজন ফখরুলের নামে জিডি করেন। পুলিশ হস্তক্ষেপ করায় কিছুদিনের জন্য চুপচাপ হয়ে যান তিনি।আরিফা রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডের একটি পাঁচতলা ভবনের একতলায় সাবলেট নিয়েছিলেন সাত-আট মাস আগে। তাঁর সঙ্গে থাকতেন মা আফিফা জামান। আফিফা কিছুদিন ধরে অন্যত্র অবস্থান করায় সপ্তাহ দুয়েক আরিফা একাই ছিলেন ওয়েস্টয়েন্ডের ওই বাসায়।

ওই বাসার বাড়িওয়ালা তাসমিন হোসেন বলেন, আরিফা বাড়ির পেছন দিকের দরজাটা ব্যবহার করতেন। গতকাল সকালেও ওই দরজা দিয়েই বেরিয়েছিলেন তিনি। তাসমিন হোসেন তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি শুনতে পান, ‘মা মা’ বলে কেউ চিৎকার করছে। ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন, আরিফা উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ওই ভবনের অন্য বাসিন্দারাও বেরিয়ে আসেন। দুই বাড়ি পরে আরিফার আত্মীয়স্বজন থাকেন। তাঁরাও ঘটনাস্থলে আসেন। আরিফাকে নিয়ে তাঁরা সবাই প্রথমে সেন্ট্রাল হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের নাক-কান-গলা বিভাগের চিকিৎসকেরা আরিফাকে চিকিৎসা দিতে আসেন। তাঁদের একজন বলেন, আরিফার গলার ডান দিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। শিরা-ধমনি দুটোই এমনভাবে কেটেছে, যেটা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আরিফা মারা যান। তাঁকে রক্তও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় করেছিলেন আরিফার সহকর্মীরা। তাঁরা বললেন, আরিফাকে তাঁর সাবেক স্বামী নানাভাবে হুমকি দিচ্ছিলেন, এটা তাঁরাও জানেন। সহকর্মীদের সামনেই আরিফাকে উত্ত্যক্ত করতেন ফখরুল। এ জন্য তাঁরা প্রায়ই আরিফাকে পুরানা পল্টনের অফিস থেকে বাসে তুলে দিয়েছেন। তাঁদের এক নারী সহকর্মী ব্যক্তিগত গাড়িতে সপ্তাহ দুয়েক ধরে আরিফাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছিলেন। ফখরুল তাই অফিসে আসার সময়টাকে হামলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন বলে অনুমান সহকর্মীদের।

আরিফার খালাতো বোন শিখা বলেন, আরিফার ব্যবহৃত কিছু জিনিস গতকাল সকালে ফেরত দিতে আসার কথা ছিল ফখরুলের। সে কথা আরিফা তাঁর সহকর্মীদের জানিয়েছিলেন।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কলাবাগান থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল। কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসির আরাফাত বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। আসামি দ্রুত ধরা পড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন।

Comments

Comments!

 Natunsokal.com

নিজ বাসার দরজায় নারী ব্যাংক কর্মকর্তা খুন

Friday, March 17, 2017 8:26 am | আপডেটঃ March 17, 2017 8:31 AM

রাজধানীর সেন্ট্রাল রোড সংলগ্ন ১৩ ওয়েস্টএন্ড স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবনের নিচতলা। সিঁড়ির কাছটা রক্তে মাখামাখি। পাছে পা লেগে যায়—এই আশঙ্কায় খুব সাবধানে এগোচ্ছিলেন ভবনের দুই বাসিন্দা। চোখে চোখ পড়তেই বললেন, এই বাসাতেই আরিফা থাকতেন। উনিই খুন হয়েছেন সকালে। এই জায়গাটাতেই।

যমুনা ব্যাংকের কর্মকর্তা আরিফুন্নেসা আরিফা গতকাল সকাল নয়টায় কাজে বের হচ্ছিলেন। দরজা খুলে বের হওয়ার পর দুপাও এগোতে পারেননি। তার আগেই গলায় ছুরি চালিয়ে সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন তাঁকে খুন করেন বলে অভিযোগ স্বজনদের। ফখরুল ইসলাম এর আগেও আরিফাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন সরাসরি এবং মুঠোফোনে। সবশেষ ফেসবুকে আরিফার বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনকেও ‘বাঁচতে দেবেন না’ বলে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আরিফার পরিবার ফখরুলের বিরুদ্ধে মাস ছয়েক আগে কলাবাগান থানায় জিডিও করে।

আরিফার গ্রামের বাড়ি জামালপুর শহরে। ফখরুলদের বাড়িও ওই একই শহরে। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস ডিপার্টমেন্টের কর্মী ফখরুল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা পড়েন।
আরিফার ভাই আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে আরিফা সবচেয়ে ছোট। ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করার পর তিনি প্রথমে সিটি ব্যাংকে চাকরি নেন। গত এপ্রিলে যোগ দেন যমুনা ব্যাংকে। ফখরুলের সঙ্গে বিয়েতে পরিবারের লোকজনের অমত থাকায় আরিফা ‘নিজেই বিয়ে করে ফেলেন’। কিন্তু তাঁর বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। নানা ছুতায় ফখরুল গায়ে হাত তুলতেন। এমনকি রাস্তার ওপর পরিচিতজনদের সামনেও একাধিকবার তাঁকে প্রহার করেছেন।

আবদুল্লাহ আল আমিন আরও বলেন, বিয়ের বছরখানেকের মাথায় একবার আরিফা তালাকের জন্য উকিল নোটিশ পাঠান। ফখরুল প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি আর মারপিট করবেন না। আরিফা ফিরে যান। কিন্তু আবারও ফখরুল নির্যাতন শুরু করেন। সাত-আট মাস আগে আরিফা তালাক দেন ফখরুলকে। এরপর থেকেই আরিফাকে হুমকি দিতে শুরু করেন ফখরুল। ছয় মাস আগে আরিফার পরিবারের লোকজন ফখরুলের নামে জিডি করেন। পুলিশ হস্তক্ষেপ করায় কিছুদিনের জন্য চুপচাপ হয়ে যান তিনি।আরিফা রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডের একটি পাঁচতলা ভবনের একতলায় সাবলেট নিয়েছিলেন সাত-আট মাস আগে। তাঁর সঙ্গে থাকতেন মা আফিফা জামান। আফিফা কিছুদিন ধরে অন্যত্র অবস্থান করায় সপ্তাহ দুয়েক আরিফা একাই ছিলেন ওয়েস্টয়েন্ডের ওই বাসায়।

ওই বাসার বাড়িওয়ালা তাসমিন হোসেন বলেন, আরিফা বাড়ির পেছন দিকের দরজাটা ব্যবহার করতেন। গতকাল সকালেও ওই দরজা দিয়েই বেরিয়েছিলেন তিনি। তাসমিন হোসেন তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি শুনতে পান, ‘মা মা’ বলে কেউ চিৎকার করছে। ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন, আরিফা উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ওই ভবনের অন্য বাসিন্দারাও বেরিয়ে আসেন। দুই বাড়ি পরে আরিফার আত্মীয়স্বজন থাকেন। তাঁরাও ঘটনাস্থলে আসেন। আরিফাকে নিয়ে তাঁরা সবাই প্রথমে সেন্ট্রাল হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের নাক-কান-গলা বিভাগের চিকিৎসকেরা আরিফাকে চিকিৎসা দিতে আসেন। তাঁদের একজন বলেন, আরিফার গলার ডান দিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। শিরা-ধমনি দুটোই এমনভাবে কেটেছে, যেটা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আরিফা মারা যান। তাঁকে রক্তও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় করেছিলেন আরিফার সহকর্মীরা। তাঁরা বললেন, আরিফাকে তাঁর সাবেক স্বামী নানাভাবে হুমকি দিচ্ছিলেন, এটা তাঁরাও জানেন। সহকর্মীদের সামনেই আরিফাকে উত্ত্যক্ত করতেন ফখরুল। এ জন্য তাঁরা প্রায়ই আরিফাকে পুরানা পল্টনের অফিস থেকে বাসে তুলে দিয়েছেন। তাঁদের এক নারী সহকর্মী ব্যক্তিগত গাড়িতে সপ্তাহ দুয়েক ধরে আরিফাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছিলেন। ফখরুল তাই অফিসে আসার সময়টাকে হামলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন বলে অনুমান সহকর্মীদের।

আরিফার খালাতো বোন শিখা বলেন, আরিফার ব্যবহৃত কিছু জিনিস গতকাল সকালে ফেরত দিতে আসার কথা ছিল ফখরুলের। সে কথা আরিফা তাঁর সহকর্মীদের জানিয়েছিলেন।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কলাবাগান থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল। কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসির আরাফাত বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। আসামি দ্রুত ধরা পড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন।

Comments

comments

X